filter: 0; jpegRotation: 0; fileterIntensity: 0.000000; filterMask: 0;

সাতক্ষীরায় ১২ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধ, আমন চাষ করতে পারেননি ২৫  হাজার কৃষক

নিজস্ব প্রতিনিধি: জলাবদ্ধতার কারণে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা যায়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ হাজার কৃষক। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় একদিকে কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য।

পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতার সংকট আরও জটিল হচ্ছে। ফলে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ক্রমেই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

জেলার অন্যতম ফসলি বিল তালা উপজেলার শাকদাহ। বিলটির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এ বিলের কৃষক সোহরাব হোসেন ও গোবিন্দ দাশ জানান, জলাবদ্ধতার কারণে গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে তাঁরা আমন ধান চাষ করতে পারছেন না। অথচ এক দশক আগেও তাঁদের জমিতে প্রচুর আমন ধান উৎপাদিত হতো। বর্তমানে শাকদাহ বিলের হাজার হাজার কৃষক আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরে শুধু বোরো ধান চাষ করা ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছে না। জলাবদ্ধতার কারণে এলাকায় গবাদিপশুর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। বিলের উন্মুক্ত চারণভূমি পানিতে ডুবে থাকায় গরু, ছাগল ও মহিষ পালনের সুযোগ কমে এসেছে বলে জানান তাঁরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় সাতক্ষীরার পাঁচটি উপজেলায় ১২ হাজার ৬৮৫ হেক্টর কৃষিজমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর, তালায় ৭ হাজার ৬৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৪৫০ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর জমি রয়েছে।

কৃষক আন্দোলন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-এলাহী জানান, সাতক্ষীরার দুর্যোগ পরিস্থিতি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে নদী ও খাল পুনঃখনন জরুরি। বিলের ভেতরে থাকা সরকারি খালগুলো সাধারণ কৃষকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব খাল দখল করে রাখায় বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ইকবাল আহমেদ জানান, সাতক্ষীরার অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আমন ধান এ অঞ্চলের কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি ফসল। কিন্তু জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় সময়মতো চারা রোপণ ও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা শুধু একটি মৌসুমের উৎপাদন থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন না, তাঁদের বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতের ব্যয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। তবে গত বছর কয়েকটি খাল পুনঃখননের ফলে চলতি মৌসুমে আমনের আবাদ প্রায় ৪৫০ হেক্টর বেড়েছে বলে জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সরদার শরিফুল জানান, জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ নয়। বসতবাড়ি ও চলাচলের পথ দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ, পয়োনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থির ও দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় গাছপালা, জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নদী ও খালের নাব্যতা বাড়াতে সরকারের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তা না হলে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জলাবদ্ধতা ক্রমেই কৃষিজমি গ্রাস করবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শিমুল মণ্ডল জানান, জলাবদ্ধতার কারণ নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় উপযোগী ফসলের জাত, বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *