গ্রামের গৃহিণী সুইয়ে সুতা, আর ফারজানার হাতে সংসারের হিসাব

ফারজানা আক্তার নিজে সেলাইয়ের কাজ করে মাসে আয় করেন এক থেকে দেড় হাজার টাকা। স্বামীর মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই চালাতে হয় সংসার। তাঁদের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের কলিমাখালী গ্রামে।

সেলাই মেশিনে পা চালানোর ফাঁকে ফাঁকে সংসারের হিসাব মেলান ফারজানা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কত টাকায় কাপড় কিনতে হবে, সেলাই করে কত আয় হবে, সেই টাকা দিয়ে কোন খরচ মেটাবেন—এসব ভাবনা ঘুরেফিরে আসে তাঁর দৈনন্দিন জীবনে। নিজের অনেক চাওয়া অপূর্ণ থাকলেও ছেলেমেয়ের পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সেটাই তাঁর বড় স্বপ্ন।

ফারজানাদের বাড়ির মাটির দেয়ালের কোথাও কোথাও ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে বিছানা, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড়—সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অল্প জায়গার মধ্যে রাখা। এক পাশে টেবিলের ওপর স্তূপ করে রাখা ছেলেমেয়ের বই। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনার চিহ্ন রয়েছে ঘরের এই ছোট্ট জায়গায়।

পাশেই স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর মাস্টারের নতুন একটি ঘর। ফারজানাদের ঘরের অবস্থা খারাপ দেখে তিনি নতুন ঘরটি সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। ফারজানার সেলাই মেশিনটি রাখা আছে ওই ঘরে। সংসারের কাজের ফাঁকে সেখানে বসেই সেলাই করেন তিনি।

ফারজানার সংসারে চারজন। ছেলে তামিম হোসেন নবম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ে আয়েশা এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন সে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার জন্য কলেজের হোস্টেলে থাকে।

রেজাল্টের দিন 

মেয়ের ফলাফলের কথা বলতে গিয়ে ফারজানার কণ্ঠে আনন্দ ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে আনন্দ হইছে মেয়েডার রেজাল্ট যখন জানতি পারিছি সেদিন। এ প্লাস পাইছে শুনে আশপাশের মানুষও আমার বাড়িতে আইসে মেয়েডারে আদর করিছে। যত কষ্টই হোক, মেয়েডারে লেখাপড়া শিখাতি চাই।’

মেয়ের এই সাফল্য ফারজানার নিজের জীবনের অপূর্ণতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় অভাবের কারণে তাঁর পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। তৃতীয় শ্রেণি থেকে স্থানীয় লুৎফর মাস্টারের বাড়িতে থেকে গৃহস্থালির কাজ করতেন। সপ্তম শ্রেণির দিকে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিয়ে হয়।

নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার আক্ষেপ এখনো আছে তাঁর। ফারজানা বলেন, ‘বড্ড আফসোস হয়, পড়াশোনাটা যদি করতি পারতাম! আমার মেয়েটা বলে, ওর চাইতে নাকি আমার মাথার ব্রেন ভালো। ওর বই পড়লে অনেক কিছু বুঝতি পারি। ও বানান ভুল করলি আমি ধরিয়ে দিতি পারি। কিন্তু স্কুলের পড়াশোনাটা আমার কপালে ছিল না।’

ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছেন ফারজানা। ১৯৮৮ সালের এক দুর্যোগের (বন্যা নাকি ঘূর্ণিঝড় মনে করতে পারলেন না তিনি) সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় দুই মাস। পরিবারের কাছ থেকে শুনেছেন, মায়ের মরদেহের পাশে তাঁকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। পরে মামারা তাঁকে বড় করেন। শৈশবের সেই অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া, নিজের সন্তানদের পড়াশোনা করানো।

প্রায় সময় ধারদেনা করা লাগে। কিছুদিন আগেও ছোট ননদের কাছ থেইকে পাঁচ হাজার টাকা ধার করিছি। দুইডা ছাগলও বিক্রি করতি হইছে। এক খরচ মেটাতি গেলি অন্য প্রয়োজন পিছাই দিতি হয়।

ফারজানা আক্তার

সংসারের হিসাব মেলাতে সেলাই

ফারজানার অসুস্থ স্বামী স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে মাছ কেনাবেচার কাজে সহায়তা করেন। স্বামী ও ফারজানার আয় মিলিয়ে মাসে সংসারে আসে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এর মধ্যে শুধু খাবারেই খরচ হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। ফারজানা বলেন, ‘প্রায় সময় ধারদেনা করা লাগে। কিছুদিন আগেও ছোট ননদের কাছ থেইকে পাঁচ হাজার টাকা ধার করিছি। দুইডা ছাগলও বিক্রি করতি হইছে। এক খরচ মেটাতি গেলি অন্য প্রয়োজন পিছাই দিতি হয়।’

সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন ফারজানা আক্তার
সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন ফারজানা আক্তারছবি: প্রথম আলো

অভাবের এই সংসারে ফারজানার সেলাইয়ের কাজের গুরুত্ব অনেক। অন্য নারীদের সেলাই করতে দেখে কাজটি শিখেছিলেন তিনি। চোখের সমস্যার কারণে এখন সুইয়ে সুতা পরাতেও কষ্ট হয় তাঁর।

নিজের চাওয়া অপূর্ণ থাকলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ছাড়েননি ফারজানা। মেয়ে যেন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, ছেলেও যেন লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে—এটাই তাঁর আশা। নিজের উপার্জন বাড়িয়ে সন্তানদের সেই স্বপ্নপূরণের পথ কিছুটা সহজ করতে চান তিনি। l

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *