স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে সাতক্ষীরার হাজার হাজার নারী# বাঁড়ছে জরায়ু কেটে ফেলাসহ অকাল গর্ভপাত

আবু সাইদ বিশ্বাস: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে নারীদের অকাল গর্ভপাত ও জরায়ু কেটে ফেলতে হচ্ছে। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলের নারীদের জীবন যেন এক অবিরাম সংগ্রামের নাম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা ও দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস তাদের। সমাজের কুসংস্কার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো নানা চাপে তারা হারাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার। যে নারী স্বামী হারানোর শোক সামলে সন্তানদের মানুষ করতে নদীতে নামেন, দিনমজুরি করেন, তিনিই আবার লবণাক্ত পানির কারণে ভোগেন বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায়। নিরাপদ পানির অভাব, সচেতনতার ঘাটতি ও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা তাদের ঠেলে দিচ্ছে নীরব স্বাস্থ্য সংকটে। অনেকেই বাধ্য হয়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এ জনপদের নারীরা তাই শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার নন, তারা লড়ছেন সমাজ, পরিবেশ এবং শরীরের ভেতরের অদৃশ্য যন্ত্রণার সঙ্গেও। টিকে থাকার এ লড়াইয়ে প্রতিদিনই তাদের জন্য নতুন পরীক্ষা, নতুন চ্যালেঞ্জ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদে দৃশ্যমান দুর্যোগের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক নীরব স্বাস্থ্য সংকট। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও অতিবৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততা আর এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছেন নারী ও কিশোরীরা। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।ঋতুস্রাবের সময়ও নারীদের ব্যবহার করতে হচ্ছে লবণাক্ত পানি; এমনকি ব্যবহৃত কাপড় পরিষ্কার করতেও নেই বিকল্প। সংক্রমণের ভয়ে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল সেবন করে মাসিক বন্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। এতে হরমোনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে বন্ধ্যত্ব, জরায়ুর জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা।
সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের দিনমজুর শেফালী মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে জরায়ুর সমস্যায় ভুগছেন। তার ভাষায়, ‘নিরাপদ পানি না থাকায় লবণাক্ত পানিতেই সব কাজ করতে হয়-এটাই রোগের বড় কারণ।’ একই চিত্র রহিমা বেগম ও আসমা বেগমের জীবনেও। জরায়ু অপসারণের পর তারা ভুগছেন শরীর জ্বালা, মাথাব্যথা ও মানসিক অস্থিরতায়। কয়রা উপজেলার ৫০ বছর বয়সি শামীমা নাসরিন বলেন, আগে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জ্বালাপোড়া করত, এখন তৈরি হয়েছে মানসিক অস্থিরতা। নিয়মিত পিরিয়ড হয় না। যখন হয়, তখন স্বাভাবিকের থেকে বেশি ব্যথা অনুভূত হয়। ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হচ্ছে না।
বেসরকারি সংস্থা সুশীলন জানায়, লবণাক্ত ও অপরিচ্ছন্ন পানি ব্যবহারের কারণে নারীরা শুধু জরায়ু ও চর্মরোগেই নয়, লিউকোরিয়া, রক্তশূন্যতা ও পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। খোলপেটুয়া এলাকায় দেড়শ’ শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অশনিসংকেত।
প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা জেজেএসের প্রকল্প সমন্বয়কারী নাজমুল হুদা বলেন, শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নারী বা কিশোরী যখন প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগে, সে ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এখন জরুরি। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের এ নীরব সংকট ভবিষ্যতে বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপত্তার আশায় আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান উপকূলের নারী ও শিশুরা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই আশ্রয়কেন্দ্রই অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে নতুন ঝুঁকির জায়গা। গবেষণা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুর্যোগের আগে ও পরবর্তী সময়ে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দুর্যোগের সময় নারীরা শুধু খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটেই ভোগেন না, বরং যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে আলাদা নিরাপদ জায়গা, শৌচাগার ও গোপনীয়তার অভাব নারীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এক প্রতিবেদনের বরাতে ডিএম ওয়াচ নামক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের সাইটে প্রকাশ করেছে, প্রায় ৬৬.৯ শতাংশ নারী ও কিশোরী দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, মূলত নিরাপত্তাহীনতা ও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্যামনগর উপজেলার একাধিক নারী জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয় নেওয়ার পথে বা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের সময়ও অনেক নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগের সময় সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়া, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হওয়া এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। একইসঙ্গে পানি সংগ্রহ বা ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানোর সময়ও তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। এ অবস্থায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারীবান্ধব অবকাঠামো, পৃথক নিরাপদ স্থান, পর্যাপ্ত আলো ও নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। তা নাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু প্রাণহানিই নয়, নারীদের জন্য তৈরি করছে আরেকটি অদৃশ্য সহিংসতার চক্র।
সাতক্ষীরা উপকূল ঘুরে দেখা গেছে, শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালি ও রমজাননগরসহ উপকূলবর্তী ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ নারী সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোতে সাত-আট ঘণ্টা রেণু পোনা ও কাঁকড়া আহরণ করেন। উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ নারীকে সংগ্রাম করে সংসার চালাতে হয়। ফলে তাদের জরায়ুসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১০.৫.২৬

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *