আবু সাইদ বিশ্বাস: জলাবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে হু হু করে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কৃষিজমিতে লবণের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি অব স্যালিনিটি (ডিএস)। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার কৃষিজমিতে ২৫ ডিএস মাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের। ২০২২ সালেও এসব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ১ ডিএস। সে হিসেবে গত চার বছরে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় সাত গুণের মত। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর প্রভাবে স্থানীয় উদ্ভিদ ও কৃষি ফলন কমে গিয়ে জীববৈচিত্র্যের বৈশিষ্ট্যেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। এত দ্রুত কীভাবে লবণাক্ততা বেড়েছে তা খতিয়ে দেখতে আরো গবেষণা করা প্রয়োজন বলেও মত তাদের। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে জেলার উপকূলীয় এলাকার চাষীরা বোরো উৎপাদনে কাক্সিক্ষত ফলন পায়নি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত অতি উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা ভয়ংকর। দ্রুত অধিকতর গবেষণা করে এর কারণ ও প্রতিকার খুঁজে বের করতে হবে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, ‘তিন-চার বছর আগেও এসব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা এত বেশি ছিল না। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা ভয়ংকর। এসব এলাকার ফসলহানি বাড়বে। তাছাড়া উদ্ভিদের বিস্তার ব্যাহত হবে। ফলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই এটা নিয়ে এখনই আরো অধিকতর গবেষণা প্রয়োজন। কেন এমনটা হলো এবং কীভাবে এটা রোধ করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।’
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার খাজাবাড়িয়া এলাকার বোরো চাষের জমিতে সর্বোচ্চ ২৫ ডিএস পর্যন্ত লবণ পাওয়া গেছে। তাছাড়া ভূগর্ভের পানিতে লবণের উপস্থিতি আরো বেশি। এসব এলাকায় গবেষণা প্রকল্পের অধীনে পরীক্ষামূলক বিভিন্ন ধান চাষ করা হলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি।’তিনি আরো বলেন, ‘অতিমাত্রার লবণের কারণে উপকূলীয় এলাকার ধান গবেষণা প্রকল্পের অধীনে প্রদর্শনী মাঠের অধিকাংশ বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুকিয়ে গেছে ধানের গাছ। তবে লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধানের জাত যেমন ব্রি-ধান ৬৭, ৯৯, ৬৩ ও ১০৮ চাষ করার জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। এসব জাত যেমন লবণ সহ্য করতে পারবে, তেমনি উৎপাদনও খুব ভালো।’
শুধু ধান গবেষণা প্রকল্পের মাঠ নয়, অতিমাত্রার লবণের কারণে জেলার উপকূলীয় কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার অসংখ্য বোরো চাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জমিতে লবণাক্ত বাড়ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাতক্ষীরা অঞ্চলের কৃষিতে। লবণাক্ততা বাড়তে থাকলে পাঁচ বছরের মধ্যে সাতক্ষীরা অঞ্চলে পরিবেশের যেমন মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে তেমনি ফসল উৎপাদনেও মারাত্মক ক্ষতি হবে। এ ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে বৃক্ষরোপণ, পুকুর ও জলাশয় তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কার্যালয় সাতক্ষীরার
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অ.দা.) মাহবুবুল আলম আসাদ জানান, জমিতে বা পানিতে লবণ একই নিয়মে থাকে না। কখনো বেশি, কখনো কম থাকে। যেমন বর্ষা মৌসুমে জমিতে লবণের উপস্থিতি কমে যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে বেড়ে যায়। তবে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার জমিতে লবণের উপস্থিতি দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কালীগঞ্জ উপজেলায় ২০২২ সালে লবণের উপস্থিতি ছিল ৪ দশমিক ১ ডিএস পরিমাণ। সেখানে গেল বছর সর্বশেষ জরিপে লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ১০ দশমিক ৯ ডিএস মাত্রায়। তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট লবণাক্ততার যে মাত্রা পেয়েছে সেটা খুবই ভয়াবহ। ২৫ ডিএস মাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেলে তা যেকোনো ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, উপকূলীয় এলাকার কৃষিজমির পাশাপাশি ভূগর্ভের পানিতেও অতিমাত্রার লবণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে ওইসব এলাকার কৃষকদের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে বোরো চাষ করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাছাড়া জেলা মাসিক সমন্বয় সভার মাধ্যমে বিলের মধ্যে সরকারি খালগুলো উন্মুক্ত করার পাশাপাশি জলাশয় ও পুকুর বা দিঘি খননের সুপারিশ করা হচ্ছে।
ক্রাইম বার্তা