বাজারে সাতক্ষীরার সুস্বাদু- সুমিষ্ট হিমসাগর আম : যাচ্ছে ইউরোপে:

৩৫০ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা
সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়ার সঙ্কা
আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার সুস্বাদু সুমিষ্ট হিমসাগর আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে ১৫ মে শুক্রুবার থেকে। ছয় মাস পরিচর্যার পর উৎপাদন ভলো দেখে আনন্দিত আম চাষিরা। হিমসাগর আমের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা দেশের গন্ডি পেরিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। প্রকৃতিক দুর্যোগ না হলে লাভের আশা বাগান মালিকদের। বাগান থেকে সংগৃহীত আম বিদেশে পাঠানো কথা জানিয়ে রপ্তানিকারক জানান, এবার বেড়ে যাওয়া প্লেন ভাড়া কমানোর দাবি তাদের। আর কৃষি বিভাগ বলছে, আম সংরক্ষণাগার নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে একটি গবেষণা কেন্দ্র খোলা গেলে আমের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়তো। বাড়তো কর্মসংস্থান। জলবায়ুর কারণে সাতক্ষীরার আম আগে পাকে। তাই জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের যৌথ সিদ্ধান্তে ১৫ মে থেকে সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করা শুরু হয়েছে। তাই ব্যস্ত সময় পার করছেন আম চাষিরা। আম চাষিরা জানান, এখান থেকেই তাদের জীবনজিবীকা নির্বাহ হয়ে থাকে। আমবাগানে কাজ করে তারা মাসে ২৪ হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক পান। ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় আসা রপ্তানিকারক জিএন ইন্টারন্যাশনালের মালিক রাসেল আহমেদ বলেন, সাতক্ষীরার হিমসাগর আম খুবই সুস্বাদু। আর বিদেশে এর চাহিদা বেশি। সেকারণে সরাসরি বাগান থেকে আম কিনলে যেমন নিরাপদ আম পাওয়া যায়, তেমনি আম চাষিরাও লাভবান হয়।
সকাল আটটার দিকে সুলতানপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে আমভর্তি ক্রেট নিয়ে দীর্ঘ সারি। বাজারের ভেতরে ঢোকারও যেন জায়গা নেই। পাইকারি ক্রেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্রেতাদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ পরিবারের জন্য, কেউ দূরের আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠানোর জন্য মৌসুমের প্রথম হিমসাগর কিনতে ব্যস্ত। সাতক্ষীরা সদরের কুখরালী এলাকার আমচাষী হাফিজুল ইসলাম খোকার বাগান থেকে এবারও যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে যাচ্ছে হিমসাগর আম। তিনি জানান, ১৫ মে শুক্রবার তার বাগান থেকে চার টন হিমসাগর আম বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তিনি প্রতি মণ আম তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। গাজীপুর থেকে আসা পাইকার লুৎফর রহমান বলেন, ‘সাতক্ষীরার হিমসাগর আমের আলাদা কদর আছে। রং, ঘ্রাণ আর স্বাদের জন্য ঢাকায় এই আমের চাহিদা অনেক বেশি। প্রথম দিনেই ভালো মানের আম পাওয়া যাচ্ছে, তাই বেশি করে কিনছি।’ তিনি জানান, আগে বাজারে আসা গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ ও গোলাপখাস আম তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়েছে। তবে হিমসাগরের চাহিদা সব সময়ই বেশি। এবার প্রথম দিনেই বাজারে প্রচুর আম উঠেছে। প্রতি মণ হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। কয়েক দিনের মধ্যে দাম আরও কিছুটা কমতে পারে বলেও ধারণা তাঁর। নাটোর থেকে আসা আরেক পাইকার আবদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘এক যুগ ধরে সাতক্ষীরার আম কিনছি। বিশেষ করে হিমসাগরের জন্যই এখানে আসা। এখানকার আমের স্বাদ আলাদা।’
তবে বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়ার সঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমের ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, সুলতানপুর বড় বাজারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চাষি ও ব্যবসায়ীদুই পক্ষকেই লোকসান গুনতে হবে। যে আম উৎপাদনে প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে, সেটি অনেক সময় ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হিমসাগর আমের দাম ভালো না পেলে অধিকাংশ চাষি ক্ষতির মুখে পড়বেন। মাঠপর্যায়ের চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বর্তমান বাজারদর তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারছে না। মৌসুমের শুরুতেই দাম পড়ে যাওয়ায় সামনে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের বাজার নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সাতক্ষীরা বড় বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওশন আলী প্রথম আলোকে বলেন, আম বেচাকেনার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সব দিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তবে বাজারে জায়গা কম হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যানজট হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, ভোক্তাদের কাছে বিষমুক্ত ও নিরাপদ আম পৌঁছে দিতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে । তিনি বলেন চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ২৯৯টি বাগানে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কৃষক আম চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশই হিমসাগর। বিদেশে রপ্তানি হওয়া আমের বড় অংশও এই জাতের। চলতি মৌসুমে ১০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বিক্রি হতে পারে।

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *