ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

আবু সাইদ বিশ্বাস: ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সুপার সাইক্লোন আম্পানের ক্ষত রয়ে গেছে সাতক্ষীরার উপকূলে। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানের ভয়াল স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি তারা।
নদীতে জোয়ার দেখলেই বুক কাঁপে উপকূলীয় বাসিন্দাদের। কারণ, ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভাঙে, কপাল ভাঙে সাগরপারের মানুষের। তারই মাঝে ২০২০ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলে ১৫১ কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছিল আম্পান। টানা ১৫ ঘণ্টা চলে ঝড়, সৃষ্টি হয় ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকার।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিয়মিত জোয়ার-ভাটার প্রভাবে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় মে মাস থেকে ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু হওয়ায় ঝুঁকির বিষয়টি আরো গুরুত্ব পাচ্ছে। অতীতে ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘আম্পান’ ও ‘ইয়াস’ ঘূর্ণিঝড়ের সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরসহ সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে । উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরকার বলেন, ১৭০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৪ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুতি রয়েছে। এদিকে, ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার-১৫ পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় ১০২০ দশমিক ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ২৯ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ৫টি রেগুলেটার প্রতিস্থাপন এবং ৯টি ইনলেট নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী এড আব্দুস সুবহান মুকুল জানান, ঘূর্ণিঝড়ের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। এখনও সেখানকার মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন। তিনি বলেন, ‘এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলোর অবস্থাও ভালো নেই। কয়েকটি জায়গায় সংস্কার করা হলেও অধিকাংশ জায়গায় রয়েছে ফাটল। যেকোনো সময় প্রবল জোয়ারের চাপে ওই বাঁধগুলো আবারও ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।’
জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ১২ হাজার ৬৯৮টি মাছের ঘেরে ১৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কৃষিতে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ৬৫ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার আম, ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সবজি, ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পান ও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার তিল। গরু ছাগল হাঁস-মুরগি মিলে ৯৫ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি হয় আম্পানের আঘাতে। আম্পানের তাণ্ডবে জেলায় মোট ৮৩ হাজার ৪৩১টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় ২২ হাজার ৫১৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০ হাজার ৯১৬টি। জেলায় ৮১ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ৫৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধসমূহ পর্যায়ক্রমে সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলমান প্রকল্পসমূহ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৭/৫/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *