ফের ডিমের বাজারে অস্থিরতা :সাতক্ষীরায় এক রাতে ডিমের দাম ডর্জনে বাড়ল ২৪ টাকা

আবু সাইদ বিশ্বাস: দেশজুড়ে আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে ডিমের বাজার। গত দুই সপ্তাহে খামারের ডিমের দাম ডজনপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৪ টাকা বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি প্রায় ৪০ টাকায় পৌঁছেছে। এরই প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার বাজারেও। জেলার বিভিন্ন আড়তে এক রাতের ব্যবধানে প্রতি পিস ডিমের দাম ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ, যাদের খাদ্যতালিকায় মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে ডিমই ছিল প্রধান আমিষের উৎস। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ডিমের দাম প্রায় ২২ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি ডিমের দামও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও বাধ্য হয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়েছেন। তবে দাম বৃদ্ধির জন্য আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খামারিরা একে অন্যকে দায়ী করছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও আড়তদারদের একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। গত সপ্তাহেও যে সাদা পোলট্রি ডিম প্রতি পিস ৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে সেই ডিম আড়তেই ১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে সোনালি ও ব্রয়লার মুরগির লাল ডিমের দাম ৮-৯ টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরার বিভিন্ন বাজারে সাদা ডিম প্রতি পিস ১০ টাকা এবং লাল ডিম ১১ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক রাতেই এমন মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা।
দেশের সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিও একই চিত্র তুলে ধরছে। ২০-২৫ দিন আগেও ডজনপ্রতি ডিম ৯৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হলেও দুই সপ্তাহ আগে তা ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায় ওঠে। বর্তমানে রাজধানীর বড় বাজারগুলোতে বাদামি ডিমের ডজন ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিমের ডজন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার বাজারে একই ডজনের দাম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরার সুলতারপুর বড়বাজারে অটোরিকশাচালক শাহআলম বলেন, “মাছ-গোশতের যে দাম, ডিম ছাড়া আমাদের আর উপায় নেই। কয়েক দিন আগেও ১০০ টাকায় ডজন কিনেছি, এখন ১৩০ টাকা দিতে হচ্ছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছে, গরিব মানুষের কষ্টও বাড়ছে।” বাজারের ডিম ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, বাজারে ডিমের সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় পাইকারি দাম বেড়েছে। তাঁর মতে, কয়েক সপ্তাহ আগে মুরগির দাম বেশি থাকায় অনেক খামারি ডিমপাড়া মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এর প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদারের অভিযোগ, প্রান্তিক খামারিরা ডিম উৎপাদন করলেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন বড় ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ঢাকার তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে সারাদেশের বাজারে দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, দাম কম থাকাকালে কিছু ব্যবসায়ী হিমাগারে ডিম মজুত করে রাখেন এবং পরে বাজারে দাম বাড়লে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে প্রান্তিক খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আমানত উল্লাহ। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ ডিম উৎপাদন ও বেচাকেনা হয়। একটি বাজার থেকে সারাদেশের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, গরমে মুরগির মৃত্যু, খামারিদের লোকসান এবং স্কুলের টিফিনে ডিম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে, যার ফলে দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে যতটা দাম বাড়ছে, খুচরা পর্যায়ে তার চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেটের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, কার্যকর বাজার তদারকির অভাব, উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয়ের ঘাটতি এবং মজুতদারির কারণে ডিমের বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠছে। তিনি বাজার মনিটরিং জোরদার, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৬/৭/২৬

 

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *