বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংঘাত দেশের জন্য অশনিসংকেত : এম সাখাওয়াত হোসেন

মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের অন্তত ছয়টির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারামারির ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া এবং ঢাকা কলেজে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

কোথাও একটি ব্যানারকে কেন্দ্র করে, কোথাও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, আবার কোথাও আধিপত্য বিস্তার ও সাংগঠনিক বিরোধের জেরে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। এসব ঘটনায় শুধু সংঘর্ষে জড়িতরাই নন, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে হাজারো সাধারণ শিক্ষার্থীর মধ্যেও। ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে অনেকের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন পর উচ্চশিক্ষাঙ্গনে কি আবারও সংঘাতনির্ভর ছাত্ররাজনীতির আবহ ফিরে আসছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুখোমুখি অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাক্‌বিতণ্ডা অল্প সময়ের মধ্যেই ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। কোথাও লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে হামলা হয়েছে, কোথাও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পাসের বাইরে হাসপাতাল কিংবা আশপাশের এলাকায়ও। এসব ঘটনায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীর পাশাপাশি আহত হয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সংবাদ সংগ্রহে থাকা সাংবাদিকরাও।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। ক্লাস-পরীক্ষা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, লাইব্রেরি ও আবাসিক হলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেকেই সংঘর্ষের আশঙ্কায় ক্লাসে যেতে কিংবা সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেশি। তারা বলছেন, সংঘর্ষ শুরু হলে অনেক সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া বা ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সুযোগও থাকে না।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনে উদ্বেগ জানিয়ে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, সংঘর্ষ দেখতে নয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলেই পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে আমরা জড়িত না থাকলেও ভয়টা আমাদেরই বেশি। পরিবার থেকেও বারবার ফোন করে নিরাপত্তার খোঁজ নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি। হলের নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বারবার সংঘর্ষ হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা শুধু নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ক্লাস করতে চাই।

উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন ঢাকা কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা কলেজে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলেও দীর্ঘ সময় পর আবার এমন সংঘর্ষের ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। সংঘর্ষ শুরু হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কী করবে, কোথায় যাবে সেটিই বড় প্রশ্ন। গতকালের ঘটনায় আমরা অনেকেই আটকা পড়েছিলাম। বাইরে কী ঘটছে, সেটিও বুঝতে পারছিলাম না। ক্যাম্পাসে এমন পরিবেশ কখনোই কাম্য নয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে মত প্রকাশের জায়গা, সংঘর্ষের নয়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তার প্রভাব যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে। প্রতিবার সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে তারা বারবার ফোন করে জানতে চায় আমরা নিরাপদে আছি কি না। প্রশাসনের উচিত দ্রুত সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরাও। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ হবে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং মুক্ত মত প্রকাশের নিরাপদ স্থান। কিন্তু যখন বারবার সংঘর্ষের খবর আসে, তখন সন্তানদের ক্যাম্পাসে পাঠানো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর মা মুসলিম ইসলাম বলেন, সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর পর প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। খবরের চ্যানেলে বা ফেসবুকে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের খবর দেখলেই মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তখন বারবার ফোন করে জানতে চাই, সে নিরাপদে আছে কি না। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন পরিবেশ থাকুক, যেখানে অভিভাবকদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে না হয়।

যেভাবে একের পর এক উত্তপ্ত হলো চার ক্যাম্পাস

সাম্প্রতিক সহিংসতার সূত্রপাত হয় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারকে ‘জুলাই অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রদর্শনীতে টানানো ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শীর্ষক একটি ব্যানারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির ছয় নেতার ছবি থাকায় আপত্তি ওঠে। ব্যানার অপসারণের দাবি ঘিরে শুরু হওয়া বাক্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।

স্থানীয় সংবাদকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক দফা সংঘর্ষে ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। এ ঘটনায় অন্তত সাতজন আহত হন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প ও মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। তবে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রবেশের সময় তাদের বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

জকসুর অভিযোগ, এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি ও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আব্দুল আলীম আরিফ, কার্যনির্বাহী সদস্য আব্দুল্লাহ আল ফারুক, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ কয়েকজন আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

এ ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। আহতদের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা, সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকও ছিলেন। অনেককে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা চলাকালেও উত্তেজনা-সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ছাত্রদল ও জকসু নেতাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের দৃশ্য দেখা যায়। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। পরে ছাত্রদলের নেতারাও পাল্টা অভিযোগ করেন, তাদের ওপরও হামলা হয়েছে এবং প্রশাসনের একটি অংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে কয়েক ঘণ্টা উত্তেজনা বিরাজ করে। আতঙ্কে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ ও বিভিন্ন ভবনে অবস্থান নেন, অনেকে ক্যাম্পাস ছেড়েও চলে যান।

একই দিন বিকেলে রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায়ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ ও সাংগঠনিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হাতাহাতি হয়। সংঘর্ষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্প জানায়, ওই দিনের বিভিন্ন সংঘর্ষে আহত অন্তত ১৭ জনকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়।

আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জানান, সংঘর্ষের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হলের কক্ষে আশ্রয় নেন।

একই সময়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা কলেজেও। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ছাত্রশিবিরের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে। ছাত্রশিবির দাবি করে, তাদের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের দাবি, শিবির পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় লাঠিসোঁটা হাতে শোডাউন হয় এবং সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকলেও পুলিশকে অনেকটা নিষ্ক্রিয় অবস্থানে দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

এরপর মঙ্গলবার দিবাগত রাতেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, মধ্যরাতে আবাসিক হল থেকে ছাত্রশিবিরের ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মীকে মারধর করে বের করে দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসময় এসব নেতাকর্মীদের মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ধাওয়া দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অন্তত একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার (৫ আগস্ট) উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজও। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির দুই নেতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। জাতীয় ছাত্রশক্তির দাবি, কলেজ সংসদের আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন ও সদস্য সচিব আল নোমান নিরবসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে সাখাওয়াত ও নিরবসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হন এবং দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সংগঠনটির আরও অভিযোগ, হামলার সময় কয়েকজন সাংবাদিকও মারধরের শিকার হন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ক্যাম্পাসের সংঘর্ষ পরিকল্পিত, হল দখলের চেষ্টা চলছে : অভিযোগ শিবির সভাপতির

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তার অভিযোগ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল দখলের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ঢাকা পোস্টকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হচ্ছে এবং হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই শিক্ষার্থী নন। বাইরে থেকে লোকজন এনে ক্যাম্পাসের পরিবেশ উত্তপ্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সাদ্দাম বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবির শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাভাবিক ক্যাম্পাস পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। কিন্তু ছাত্রদল শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে ‘মব’ সৃষ্টি ও দোষারোপের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, হামলার শিকার হওয়ার পরও ছাত্রশিবির সহনশীলতা দেখাচ্ছে। তবে এই সহনশীলতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ভাষায়, ছাত্রদল আবারও ক্যাম্পাসে সহিংসতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনছে, যা শিক্ষার্থীরা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংঘাত দেশের জন্য অশনিসংকেত : এম সাখাওয়াত হোসেন

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তির সময় এ ধরনের সংঘাত অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, পরিস্থিতি সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং এর পেছনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে আগ্রহী তৃতীয় পক্ষ সক্রিয় থাকতে পারে।

তিনি বলেন, এভাবে সংঘাত চলতে থাকলে দেশের অর্জন ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। দুই পক্ষ নিজেদের সংযত না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং এটি বর্তমান সরকারের জন্যও অশনিসংকেত।

পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতার কারণে বাহিনীর মধ্যে এখনো এক ধরনের মানসিক ট্রমা কাজ করছে। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমানভাবে পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *