নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সভাপতির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে শিক্ষকদের স্বাক্ষর, দ্বন্দ্বের প্রভাব এসএসসি ফলাফলেও

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির সভাপতির পদ স্থগিতের পর নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর করা আবেদনে শিক্ষক-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের শিক্ষক-পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের বিরোধের প্রভাব বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ ও সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফলেও পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ।
১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়টি সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকায় সরকারি মহিলা কলেজের পাশে অবস্থিত। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নারীশিক্ষায় ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জেলার বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। নয়বার জেলার বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জনের কথাও জানিয়েছেন তারা। তবে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক বিরোধ ও শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সেই সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ এখন প্রশ্নের মুখে।
শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, গত ১৬ আগস্ট রাতে নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সভাপতির স্বাক্ষরে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীকে সামরিক বহিষ্কার করেন। এরপর গত ২০ আগস্ট যশোর শিক্ষা বোর্ড নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শাহ মো. কামরুজ্জামানের পদ স্থগিত করেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সভাপতির পদ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদনপত্রে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সহকারী শিক্ষক কবীর আহমেদের মাধ্যমে ওই স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী স্বাক্ষর করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এমনকি স্বাক্ষর নেওয়ার সময় সভাপতির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিয়ে এমনিতেই উদ্বিগ্ন। স্বাক্ষর না করলে পরে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় কি না, সে ভয়ও ছিল। এ কারণে অনেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর করেছেন। আরেক শিক্ষক বলেন, স্বাক্ষরটি কার পক্ষে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে এ বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার ছিল না। শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বাধীন মতামতের সুযোগ থাকা উচিত।
তবে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়ে সহকারী শিক্ষক কবীর আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফল নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো দুই বছরের ব্যবধানে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক কমে যাওয়া এবং অকৃতকার্যের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।
২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ১৩৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। সবাই উত্তীর্ণ হয়। এ প্লাস পায় ৫৫ জন এবং সাতজন শিক্ষার্থী বৃত্তি অর্জন করে। ২০২৫ সালে ১৩৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এ প্লাস পায় ১৬ জন। ওই বছর অকৃতকার্য হয় ৯ জন এবং কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়নি। ২০২৬ সালে ১৩৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এ প্লাস পেয়েছে মাত্র ১৫ জন। বিপরীতে অকৃতকার্য হয়েছে ২৯ জন।
অর্থাৎ ২০২৪ থেকে ২০২৬ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫ থেকে কমে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অকৃতকার্যের সংখ্যা শূন্য থেকে বেড়ে হয়েছে ২৯।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের একটি অংশের অভিযোগ, শিক্ষক-কর্মচারী ও পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রভাব পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশে পড়েছে। এর প্রভাব ফলাফলেও প্রতিফলিত হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তবে ফলাফল কমার একমাত্র কারণ শিক্ষক-সভাপতি দ্বন্দ্ব কি না, সেটি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের একজনের দাবি, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
তার ভাষ্য, একসময় বিদ্যালয়ের ফান্ড প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও বর্তমানে তা কোটি টাকার ওপরে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কয়েকগুণ বেড়েছে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি জেলার অন্যতম সফল বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছিল।
ওই অভিভাবক বলেন, স্কুলের যে সাফল্য, তার সঙ্গে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর বড় ভূমিকা রয়েছে। এখন শিক্ষক ও পরিচালনা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তাতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব যদি চলতে থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সুনাম ধরে রাখা কঠিন হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাঃ আবুল খায়ের বলেন, যশোর বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছে, আবার তারাই বাতিল করেছে। শিক্ষা অফিসকে তারা অবগত করেনি। স্কুলের ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা তদন্ত করেছেন। যশোর বোর্ড থেকে আমরা কোনো চিঠি পাইনি। তবে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।
তিনি বলেন, শিক্ষকরা সবাই মিলে স্কুল রক্ষায় কাজ করলে ভালো হতো। কিন্তু শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ রয়েছে। এখন বিষয়টি ধীরে ধীরে দলীয়করণের দিকে যাচ্ছে। শিক্ষকরা এমএ পাস তারা যদি জোরপূর্বক স্বাক্ষর করেন, তাহলে সেখানে কার কী করার আছে?
নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, শিক্ষক, সভাপতি কিংবা পরিচালনা নিয়ে যে বিরোধই থাকুক না কেন, তার প্রভাব যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় না পড়ে। তারা দ্রুত অভ্যন্তরীণ বিরোধের অবসান, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *