নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি শীর্ষক পর্যালোচনা’
স্টাফ রিপোটার: সাতক্ষীরার উন্নয়নে সরকারি ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো একে একে বাস্তবায়ন করা হবে। সাতক্ষীরার মানুষের সমস্যা, প্রত্যাশা ও দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনে বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে ‘যুব-নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক ফলোআপ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিডোর বাস্তবায়নে এবং একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় এফরটি প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় চাহিদা নিরূপণ ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় এ সভার আয়োজন করা হয়। সিডো সাতক্ষীরার প্রধান নির্বাহী শ্যামল কুমার বিশ্বাসের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুল, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাসান হাদি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত। সভায় জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ফরিদা আক্তার বিউটি, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্লাবণী সরকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রতিনিধি, ভয়েস অব সাতক্ষীরা ও এটিএন বাংলার প্রতিনিধি এম কামরুজ্জামান, মাছরাঙা টেলিভিশন ও দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিনিধি মো. মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি এবং স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্তসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সিডো সাতক্ষীরার প্রধান নির্বাহী শ্যামল কুমার বিশ্বাস। যুব-নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ইশতেহারে সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় স্থানীয় উন্নয়নের চাহিদা নিরূপণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সাতক্ষীরা ইয়ুথ হাবের সভাপতি সাকিব হাসান।
সভায় স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত সাতক্ষীরাসহ দেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ ভারত একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কারণে নদীগুলো ক্রমেই মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনে। তিনি ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, কৃষিতে সেচসংকট এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে।
মাধব দত্ত আরও বলেন, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যথাযথ জরিপ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়েও তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ সমীক্ষা ও নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বিবেচনার আহ্বান জানান।
সভায় সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানির ঘের সম্প্রসারণের ফলে অনেক এলাকায় কৃষিজমির উর্বরতা কমেছে। মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির সংকট, ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষিজমি হারিয়ে অনেক পরিবার বিকল্প জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হওয়ায় বস্তিবাসীর সংখ্যাও বাড়ছে বলে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব কৃষি, মিঠাপানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় সাতক্ষীরার সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টেকসই উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণ, সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাণসায়র খালের আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান রোধ, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষির প্রসার, যুব ও নারীর দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভোমরা স্থলবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপান্তর, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়। জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সাতক্ষীরায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘ইলেকশন মেনিফেস্টো সংলাপ’-এ সাতক্ষীরার বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের কাছে স্থানীয় জনগণের দাবি ও প্রত্যাশা উপস্থাপন করা হয়। সেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করতেই এবারের ফলোআপ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন উদ্যোগ চলমান, কোনগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় এবং কোথায় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। এমপি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, “সাতক্ষীরার উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা দলের বিষয় নয়। সরকারি ও বিরোধী দলসহ সবাইকে জনগণের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সাতক্ষীরার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব।” তিনি বলেন, সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। জনগণ তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করবেন।
সভায় অসম্পূর্ণ উদ্যোগগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ এবং জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
ক্রাইম বার্তা