প্রথম আলো ও একশনএইডের সংলাপ
নিরাপদ পানি ও টেকসই বেড়িবাঁধ চান সাতক্ষীরার নাগরিকেরা
স্টাফ রিপোটার:
সুপেয় পানির সংকট নিরসন, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং নদী-খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জাতীয় বাজেটে সাতক্ষীরার জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, সাতক্ষীরা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উপকূলীয় এ জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানির সংকট, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যায় ভুগছেন। শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার, কাজের মান ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের হলরুমে প্রথম আলো ও একশনএইড বাংলাদেশের সুশীল প্রকল্পের উদ্যোগে ‘জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে এসব দাবি জানানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় আয়োজিত সংলাপে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রত্যাশা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
সংলাপে ‘সমষ্টি’র গবেষণা পরিচালক রেজাউল হক ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার মানুষের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে নদী-খাল খনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, লবণাক্ততাসহিষ্ণু কৃষি, টেকসই জীবিকা, ঘূর্ণিঝড় থেকে সুরক্ষা এবং নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থান। উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও নারীর শ্রমের সঙ্গে নিরাপদ পানির সংকট গভীরভাবে জড়িত। জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও জেলাভিত্তিক বরাদ্দ, ব্যয় ও উপকারভোগীদের তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। এসব তথ্য প্রকাশ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন।
সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধানের দাবি: সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার নিরাপদ পানির সংকটের কথা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বিশেষ করে শ্যামনগর ও আশাশুনির উপকূলীয় অঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপন করেও অনেক স্থানে সুপেয় পানি পাওয়া কঠিন। অনেক পরিবারকে পানি কিনে খেতে হয়, আবার সামর্থ্য না থাকায় অনেকে নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত হন। এ সংকট সমাধানে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পানির গুণগত মান বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরার অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করেও নিরাপদ পানি পাওয়া যায় না। তাঁর বাসস্থান কালীগঞ্জ উপজেলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কয়েকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ পানি পাচ্ছেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রকৌশলগত গবেষণা ও উপযুক্ত প্রযুক্তির সমন্বয়ে টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, সরকারি পুকুর ইজারা বন্ধ করে সেগুলো সুপেয় পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি বা দুটি পুকুর দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে জমি অধিগ্রহণ করে পুকুর খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সুলভ মূল্যে গভীর নলকূপ সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে।
সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক আহসান রাজিবও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ নিরাপদ পানির স্থায়ী উৎস তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। নারী অন্ত্যজ পরিষদের সুমা সরকার বলেন, নিরাপদ পানির অভাবে নারীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। লবণাক্ত পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। তাই নিরাপদ পানি সরবরাহের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতা দূর করতে নদী-খাল খনন ও টেকসই বাঁধ: শ্যামনগরের আতরজান মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, জলাবদ্ধতা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির কারণে সাতক্ষীরার উন্নয়ন চাহিদা দেশের অন্য এলাকার চেয়ে আলাদা। তাই জনসংখ্যার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
এ বিষয়ে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিতভাবে চিংড়িঘের করার কারণে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকছে। ঘের ব্যবস্থাপনায় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধার ও খননের পাশাপাশি সাতক্ষীরা শহরের প্রাণসায়ের খাল দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। খাল খনন ও প্রশস্ত করা গেলে পানি নিষ্কাশনের উন্নতি হবে এবং শহরের জলাবদ্ধতা কমবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, সাতক্ষীরায় ২২ থেকে ২৩ হাজার হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয় এবং ২৫ থেকে ৩০ হাজার কৃষক কর্মহীন হয়ে পড়েন। জলাবদ্ধতা নিরসনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমিহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্য আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হবে।
কর্মসংস্থান, কৃষি ও উপকূলীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ব: সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল বারী বলেন, মৎস্য, কৃষি, আম-কুল, দুধ, মধু, ভোমরা স্থলবন্দর ও সুন্দরবনের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। কিন্তু জেলার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে। উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো: জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, সাতক্ষীরায় ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচিতে বর্তমানে ২০ হাজার ৯১১ জন নারী সুবিধা পাচ্ছেন। এ সংখ্যা দ্বিগুণ করা গেলে আরও বেশি নারীকে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনা সম্ভব হবে। দুর্যোগকবলিত, নির্যাতনের শিকার ও বিপদগ্রস্ত নারীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং নারীদের প্রশিক্ষণ ভাতা বাড়ানোর দাবিও জানান তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ ভাতা আগে ১০০ টাকা থাকলেও গত বছর তা কমে ৫০ টাকায় নেমেছে। নাজমুন নাহার বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সহযোগিতা প্রয়োজন। পর্যটন খাতের উন্নয়ন করা গেলে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
জেলা কালচারাল অফিসার ফাইজা হোসেন অন্বেষা বলেন, সাতক্ষীরার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে শিল্পকলা একাডেমি ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন। তালা উপজেলা ছাড়া অন্য উপজেলাগুলোতে এ ধরনের অবকাঠামো নেই। জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভবনটিও দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ। সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্থানীয় প্রতিভা বিকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
শিক্ষা, যোগাযোগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি: সাতক্ষীরা জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল বলেন, সাতক্ষীরায় সাতটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভা রয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দর, সুন্দরবন ও মৎস্য খাত থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেলেও জেলার অবকাঠামো ও জনসেবার উন্নয়নে আরও বরাদ্দ প্রয়োজন। জেলার প্রায় দেড় হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ২৫০টির নিজস্ব ভবন নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শহরের যানজট কমাতে কার্যকর বাইপাস এবং ভোমরা স্থলবন্দর থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও সুন্দরবনমুখী পণ্যবাহী যান চলাচলের উপযোগী সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ইমতিয়াজ উদ্দীন। সংলাপ সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন একশনএইড বাংলাদেশের সুশীল প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মৌসুমী বিশ্বাস।
ক্রাইম বার্তা