আবু সাইদ বিশ্বাস,সাতক্ষীরা: আসন্ন ঈদুল আযহাকে ঘিরে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে টানতে নতুন রূপে সেজেছে সাতক্ষীরার দর্শনীয় স্থানগুলো। সুন্দরবন উপকূলীয় এই জেলায় একাধিক বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে। বছরজুড়ে নানা বয়সের মানুষ ছুটে আসেন সাতক্ষীরার আকর্ষণীয় স্পটগুলোতে। এর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরা শহরের খড়িবিলায় মোজাফ্ফর গার্ডেন বা মন্টু মিয়ার পার্ক, কামাল নগরে লেকভিউ পার্ক, সীমান্ত নদী ইছামতির তীরে অবস্থিত রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র বা মিনি সুন্দরবন, শ্যামনগরে আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার ও সুন্দরবন।
রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক সুযোগ–সুবিধা এবং নানামুখী বিনোদনের সমন্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র।সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলায় ইছামতি নদী তীরে প্রায় ১৫০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই ম্যানগ্রোভ বন একসময় নদীভাঙন রোধে তৈরি করা হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে সেই বন এখন রূপ নিয়েছে ‘মিনি সুন্দরবন’ নামে। সেখানে প্রতিদিন টানছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু নানান বয়সের মানুষকে। বনের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে ট্রেইল পথ, যে পথ ধরে হাঁটলে পাওয়া যায় এক অনন্য অভিজ্ঞতা। চারপাশে কেওড়া, বাইন, সুন্দরী, গোলপাতাসহ সুন্দরবনের আদলে রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ প্রকৃতির এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ ‘অনামিকা লেক’। প্রায় ১০ একর আয়তনের এই লেকের পাড়ে তৈরি করা হয়েছে পাকা ঘাট। নির্মল পরিবেশে দর্শনার্থীরা নৌকায় ভ্রমণ করতে পারেন। পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়া ও শিশুদের জন্য বিভিন্ন বিনোদন ব্যবস্থা, যা পরিবারসহ বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আনন্দ যোগ করে। বছরের শুরুতে, শীত মৌসুম এলেই শুরু হয় পিকনিকের ধুমধাম। নামমাত্র ২০ টাকা দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়। দেশের নানান প্রান্ত থেকে মানুষ আসে এই বিনোদন কেন্দ্রে। দলবেঁধে রান্নাবান্না করে, আয়োজন করে চড়ুইভাতির। কয়েক মাসজুড়ে চলতে থাকা এই উৎসবমুখর পরিবেশ ঈদকে ঘিরে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় আমরা সব সময় সচেষ্ট। ছুটির দিনে এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। তাদের সুবিধার্থে সব ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম তরিকুল ইসলামের উদ্যোগে ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের সূচনা হয়। পরে সাবেক ইউএনও হাফিজ আল–আসাদের সময় ব্যাপক উন্নয়ন হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠে। দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, এখানে এলে অনেকটা সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। পর্যটকদের জন্য আরও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মোজাফ্ফর গার্ডেন: সাতক্ষীরা শহরের ৭নং ওয়ার্ডে খড়িবিলা এলাকায় ১২০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে মোজাফ্ফর গার্ডেন, যা মন্টু মিয়ার বাগান বাড়ি নামেও পরিচিত। মোজাফ্ফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্টে থাকার জন্য ৪টি ভবনে মোট ৩০টি কক্ষ রয়েছে। রয়েছে আধুনিক সব ব্যবস্থা– সুদীর্ঘ লেক, প্যাডেল বোট, মাছ ধরার ব্যবস্থা, মাছের অ্যাকুরিয়াম, থ্রিডি থিয়েটার, চিড়িয়াখানা, চিল্ড্রেনপার্ক, খেলার মাঠ, বিভিন্ন আকর্ষণীয় ভাস্কর্য। এই বিনোদন কেন্দ্রের চিড়িয়াখানাকে দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি চিড়িয়াখানা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি আগত অতিথিদের নজর কাড়ে। বছরের অধিকাংশ সময়ই লোকসমাগম থাকে এখানে। মোজাফ্ফর গার্ডেনের তত্ত্বাবধায়ক আতিক হোসেন বলেন, প্রতিবছর ঈদ আসলেই এ বিনোদন কেন্দ্রে সব বয়সি মানুষের ভিড় থাকে সপ্তাহজুড়ে। সে কারণে সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে করা হয়েছে বাড়তি আলোকসজ্জা।
আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার: বিশ্ব ঐতিহ্যখ্যাত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত সুন্দরবনের পাদদেশে গড়ে উঠেছে আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার। এটি গড়ে উঠেছে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের সর্বশেষ জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মালঞ্চ নদীর চরে। সুন্দরবন দর্শনের জন্য প্রতিবছর দেশী ও বিদেশি প্রচুর পর্যটক সমাগম ঘটে। আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার গড়ে উঠেছে মূলত সুন্দরবন ভ্রমণ পিপাসুদের কথা চিন্তা করে। ২০১৮ সালে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ জীবনানন্দ দাশের আকাশলীনা কবিতা অবলম্বনে এই মিনি পর্যটন কেন্দ্রটির নামকরণ করেছেন। সুন্দরবন ভ্রমণ পিপাসু দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা বজায় রেখে প্রায় ১৭ একর জমি নিয়ে আকাশলীনার যাত্রা শুরু হয়।
সারি সারি সুবিশাল কেওড়া গাছের মধ্য দিয়ে আঁকা বাঁকা মনোরম দৃশ্যধারী সরু রাস্তা আর মাঝে মাঝে বসার জন্য গোলপাতার ঘর এক প্রাকৃতিক স্বপ্নপুরি। দেখা যায় নানা প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, পাখ–পাখালী ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। সুন্দরবন জনগোষ্ঠীর জীবন–জীবিকার বাস্তব চিত্র দেখা যায়– বাওয়ালী নিয়ে যাচ্ছে জ্বালানি, ধুনুরী ধরে বরশি দিয়ে মাছ, মৌয়ালী সংগ্রহ করছে মধু, মাছ ও কাঁকড়া ধরছে জেলে। ভাগ্য সহায়ক হলে দেখা মিলবে কুমির, হরিণ, বানর, সাপ, শূকর ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে। রয়েছে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার। যেখানে উঠলে সুন্দরবনের বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। প্রতিদিন বহু দূর দুরন্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থী আসে আকাশলীনার নির্মল পরিবেশে হৃদয়কে একটু হালকা করার জন্য। ডুবু ডুবু সূর্যের রক্তিম সন্ধ্যায় সুন্দরবনের কোলে বসে নদীর কুল কুল ধ্বনীতে যে কারোরই হৃদয় নেচে উঠবে। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুজ্জামান কনক বলেন, ঈদুল আযহা সামনে রেখে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রতিবছর ঈদে সপ্তাহজুড়ে হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত থাকে আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টার।
ক্রাইম বার্তা