আবু সাইদ বিশ্বাস: হুমকিতে সুন্দরবনের বাঘ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং খালের নাব্য হ্রাসের ফলে মিঠাপানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হরিণসহ তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যা কমায় বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ ও ১৯টি শাবকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই আশাবাদের আড়ালেই সামনে এসেছে নতুন উদ্বেগ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের অধিকাংশ বাঘের শরীরে বাসা বেঁধেছে একাধিক পরজীবী। একই সঙ্গে শনাক্ত হয়েছে এমন কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যেগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত অনেক অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। অন্যদিকে ছয় মাস চিকিৎসার পর বনে অবমুক্ত করা একটি বাঘিনীর ১৬ দিনেও কোনো সন্ধান না মেলায় সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়লেই সংরক্ষণের সাফল্য নিশ্চিত হয় না; তাদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ আবাস ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৬০৫টি গ্রিডে ১ হাজার ২১০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসিয়ে ৩১৮ দিন ধরে তথ্য সংগ্রহ করে বন বিভাগ। ১০ লাখের বেশি ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে শনাক্ত হয় ১৯টি শাবক। এর আগে, ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে ১১৪। সর্বশেষ জরিপে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২ দশমিক ৬৪টি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাঘের বিচরণ সবচেয়ে বেশি শরণখোলা, চাঁদপাই, সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটক ও বনকর্মীদের চোখে আগের তুলনায় বেশি বাঘ ধরা পড়ছে, যা বনে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও নিরাপদ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ এখন শুধু চোরাশিকার বা মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকিতে নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, রোগজীবাণুর বিস্তার, জিনগত বৈচিত্র্যের সংকট এবং আধুনিক রোগব্যাধিও নতুন করে হুমকি হয়ে উঠছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বনজীবী নুর ইসলাম ও হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী জানান, আগের মতো বনে হরিণ বা বাঘের বিচরণ এখন আর দেখা যায় না। তা ছাড়া বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনা ঘটছে। শিকারের কারণে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঘকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরবনের পুরো বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের পরিবেশগত নিরাপত্তা। তাই বাঘ সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে চোরাশিকার ও বন্যপ্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বনের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন রাখা।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, মিঠাপানির সংকট দূর করতে বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করা হয়েছে। চোরাশিকার প্রতিরোধে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।
ক্রাইম বার্তা