মাদকে ভাসছে সাতক্ষীরা

৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মাদক ধ্বংস করলেও গডফাদাররা অধরাই

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা যেন ক্রমেই মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রবেশপথে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবছর সীমান্তে কোটি কোটি টাকার মাদক উদ্ধার ও ধ্বংস করা হলেও থামছে না মাদকের প্রবাহ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হলেও, এসব চোরাচালানের মূল হোতা বা গডফাদাররা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে সীমান্তজুড়ে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাদক উদ্ধার হলেও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না কেন? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বাহক ও খুচরা কারবারিরা ধরা পড়লেও, এই চোরাচালান চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে বলে তাদের অভিমত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীরা বাংলাদেশকে অনেক সময় ট্রানজিট বা রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশের পাশাপাশি অন্যত্র পাচারেরও চেষ্টা চলে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের তরুণ সমাজ। মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে যুবসমাজের একটি অংশ বিপথগামী হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক অপরাধও বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে সীমান্তে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি)।
রোববার (২৮ জুন) সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আয়োজিত “মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠান-২০২৬”-এ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব মাদক ধ্বংস করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান, ওএসপি, পিএসসি। বক্তব্য দেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউছার আজিজ, খুলনা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. মাসুদুর রহমান, পিএসসি, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদি হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুরুল্লাহ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান শরীফসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন বিওপি এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ৪৮ জনকে আটক করা হয়। এ সময় প্রায় ১২৬ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫৬ টাকা মূল্যের বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য এদিন ধ্বংস করা হয়েছে।
ধ্বংস করা মাদকের মধ্যে ছিল ৩ হাজার ৭৯১ বোতল বিভিন্ন ধরনের মদ, ৪ হাজার ৫২৪ বোতল ফেনসিডিল, ৪৭ হাজার ২৭০ পিস ইয়াবা, ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৬৯ পিস বিড়ি ও সিগারেট, ৩৩ দশমিক ৪০০ কেজি গাঁজা, ৬৩ লাখ ১৩ হাজার ১২০ পিস অবৈধ ঔষধ, ৩৫ কেজি তামাকের গুঁড়া, ২ বোতল লিকুইড সীসা, ১০০ কেজি মাদক তৈরির কাঁচামাল, ৭২ দশমিক ৫০ মিলিলিটার এলএসডি, ৮ দশমিক ৫৮৩ কেজি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) এবং আফিম তৈরির ২০ বোতল কেমিক্যাল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান বলেন, “মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিজিবি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা দিন-রাত দায়িত্ব পালন করে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা। এটি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে বক্তারা মাদকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিজিবি জানায়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতেই নিয়মিতভাবে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য জনসম্মুখে ধ্বংস করা হচ্ছে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৮/৬/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *