সাতক্ষীরায় বাঁশ ও গোবর সার বিতরণে অনিয়ম: কাগজে-কলমে ১৫০ কেজি সার, মিলছে ৪০ কেজি, ৫০ টাকার খুঁটির দাম ১০ টাকা!

ক্রাইমবাতা রিপোট: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। কিন্তু সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পটিতেই ভর করেছে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির ছায়া। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে গাছের চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার বিতরণের নামে চলছে প্রকাশ্য হরিলুট। সরকারি পত্রে বরাদ্দের যে হিসাব দেখানো হয়েছে, বাস্তবতার সাথে তার কোনো মিল নেই। সাধারণ কৃষকদের মুখ বন্ধ রেখে কাগজে-কলমে সই নিয়ে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১ হাজার ২০০ জন কৃষককে এই প্রণোদনা সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিজন কৃষক পাঁচটি গাছের চারা, ৫টি বাঁশের খুঁটি এবং ১৫০ কেজি জৈব সার (গোবর) পাওয়ার কথা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে—প্রতি পিস গাছের চারা ১৬০ টাকা, প্রতি পিস বাঁশের খুঁটি ৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি জৈব সার (গোবর) ৪ টাকা। এছাড়া পরিবহন ও আনুষঙ্গিক অপ্রত্যাশিত ব্যয়ও ধরা হয়েছে পৃথকভাবে।

কিন্তু গত সোমবার (২৯ জুন) সদর উপজেলায় চারা ও উপকরণ বিতরণকালে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। কৃষকদের ১৫০ কেজি গোবর সার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজি। অথচ চতুর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের কাছ থেকে ১৫০ কেজি সার বুঝে পেয়েছেন মর্মে স্বাক্ষর বা টিপসই করিয়ে নিচ্ছেন।

মাঠে দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তন্ময় মন্ডলের কাছে এই গড়মিলের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ধোঁয়াশাপূর্ণ কণ্ঠে তিনি কেবল বলেন, একটু সমস্যা আছে। স্যারদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রকল্পের বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়েছে গাছের চারা সোজা রাখার জন্য দেওয়া বাঁশের খুঁটিতে। সরকারি খাতায় প্রতি পিস খুঁটির মূল্য ধরা হয়েছে ৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের সরবরাহ করা হয়েছে অত্যন্ত নি¤œমানের বাঁশের কঞ্চি বা খুঁটি, যার বাজারমূল্য কোনোভাবেই ১০ থেকে ২০ টাকার বেশি নয়। বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয় বাঁশ ব্যবসায়ী আশারুল ইসলামের দ্বারস্থ হলে তিনি খুঁটি পরীক্ষা করে জানান, এই খুঁটির মান খুবই খারাপ, স্থানীয় বাজারে এর মূল্য ১০ টাকার বেশি হতে পারে না।
এমনকি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. জামালউদ্দীনও খুঁটির নমুনা দেখে স্বীকার করেছেন, যে এগুলোর মান অত্যন্ত নি¤œ এবং এর প্রকৃত মূল্য ১০ টাকার বেশি নয়।

সার বিতরণের এই হরিলুট নিয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ শুভ্র’র দাবি এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। ১৫০ কেজি গোবরের পরিবর্তে তাদের ৬০০ টাকা মূল্যের ৪০ কেজির ‘কোম্পানির সার’ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে খামারবাড়ির অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. জামালউদ্দীনের দাবি, ওই এক বস্তা সারের মূল্য ৪৮০ টাকা। সরকারি পত্রে যেখানে ৪ টাকা কেজি দরে ১৫০ কেজি গোবরের দাম ৬০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেখানে কর্মকর্তারা একেক সময় একেক দামের বস্তা সারের অজুহাত দিয়ে কৃষকদের ঠকাচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কৃষক প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকারি পত্রে যেখানে স্পষ্ট ‘গোবর সার’ ও সুনির্দিষ্ট ওজনের কথা উল্লেখ আছে, সেখানে কর্মকর্তারা কার অনুমতিতে কোম্পানির বস্তা সার দিলেন এবং ওজনে ১১০ কেজি কম দিলেন?
ভুক্তভোগী কৃষকেরা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগকে মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের পকেট ভারী করার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন।

হিসাব কষে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১ হাজার ২০০ কৃষকের বরাদ্দের কেবল বাঁশের খুঁটি এবং জৈব সারের অংশটি থেকেই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রায় ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা লুটপাট করেছেন। সমগ্র সাতক্ষীরা জেলায় এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৮ হাজার ৬০০ জন কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মোট প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। সদর উপজেলার এই চিত্র যদি পুরো জেলার প্রতিফলক হয়, তবে সামগ্রিক লুটপাটের অঙ্ক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের এ ধরনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাতক্ষীরা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সংগঠনটির সভাপতি মো. তৈয়েব হাসান সামছুজ্জামান বলেন, সরকারি উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ ওঠা এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।

কৃষি বিভাগের এই প্রকাশ্য অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাউসার আজিজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *