ভারতীয় নাগরিক শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ‘প্রেরণা’ পরিচালনার আড়ালে ভারতীয় নাগরিক শম্পা গোস্বামী (ওরফে শম্পা চ্যাটার্জি)-এর বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়ম, দ্বৈত নাগরিকত্ব, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা, সরকারি সম্পদ দখল, অর্থ পাচার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও জমা পড়েছে।
তবে শম্পা গোস্বামী তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা।
রাজনৈতিক প্রভাব ও এনজিও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শম্পা গোস্বামী সাতক্ষীরায় নিজের কার্যক্রম বিস্তৃত করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত পরিবেশ ও সমাজসেবামূলক প্রকল্পের আড়ালে তিনি একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পক্ষে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাতক্ষীরা শহরের একটি ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় তার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ উঠলে তিনি ভারতীয় পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয় সামনে এনে বিষয়গুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তদন্তের দাবি
সম্প্রতি কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকায় শম্পা গোস্বামীর কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী দাবি করেছেন, প্রেরণা এনজিওর নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস এবং পরিচালন কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রবীণ সাংবাদিকের অভিযোগ
সাতক্ষীরার প্রবীণ সাংবাদিক আহমাদুল্লাহ বাচ্চু অভিযোগ করেন, শম্পা গোস্বামীর ভারতে বসবাস, আধার কার্ড, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন সরকারি নথির তথ্য রয়েছে। এছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্যামনগর সফরের সময় তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মোজাহার মেমোরিয়াল স্কুলের শিক্ষক থাকা অবস্থায় দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও তিনি কমিটির বিরুদ্ধে মামলা করেন। গাছ কাটার ঘটনায় কারাভোগ, সরকারি কলেজের জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সরকারি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ভারতীয় নথিপত্রের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, শম্পা গোস্বামীর নামে ভারতে আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র ও আয়কর নথি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট পোস্ট অফিসে তার নামে কেভিপি, আরডি ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে খোলা এক লাখ রুপির ১০ বছর মেয়াদি আমানতের তথ্যও রয়েছে।
এছাড়া বসিরহাটের একটি ব্যাংকে তার ও তার মা অনিতা গোস্বামীর যৌথ হিসাব পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বসিরহাটে জমি ক্রয় ও বাড়ি নির্মাণের তথ্যও বিভিন্ন নথিতে রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে একটি পোস্ট অফিস হিসাবের নথি হারিয়ে গেলে শম্পা গোস্বামী নিজেই বসিরহাট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তার বাংলাদেশি পাসপোর্টের ভ্রমণ তথ্য যাচাই করলে ২০১৭ ও ২০২২ সালে ভারতে দীর্ঘ সময় অবস্থানের তথ্য পাওয়া যাবে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে শাফি মোদ্দাছির খান জ্যোতির সঙ্গে শম্পা গোস্বামীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্কের প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জে ২৬ কাঠা জমি কিনে সেখানে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে কাঠের বিলাসবহুল বাড়ি, পাঁচ কক্ষের শপিং কমপ্লেক্স এবং পাঁচতলা ভবনের নির্মাণকাজ করা হয়েছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
মেয়ের শিক্ষাজীবন নিয়েও অভিযোগ
শম্পা গোস্বামীর বড় মেয়ে বৈশাখী চ্যাটার্জির বিরুদ্ধেও শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি ভারতে পুনরায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে সেই তথ্য গোপন রেখে বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এ ভর্তি হন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট ও শিক্ষা নথি যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
সাবেক জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, শম্পা গোস্বামী নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তিনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন, সেখান থেকে শম্পাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো বিদেশি নাগরিক ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বাংলাদেশে ব্যবসা বা এনজিও পরিচালনা করলে তা আইনের লঙ্ঘন। অভিযোগ সত্য হলে প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রশাসনের অবস্থান
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, তথ্য গোপন করে বা ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে এনজিও বা ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শম্পা গোস্বামীর বক্তব্য
সব অভিযোগ অস্বীকার করে শম্পা গোস্বামী বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার মা জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং বিবাহসূত্রে বাংলাদেশি—এটি অপরাধ নয়।
ভারতের আধার কার্ড ও অন্যান্য নথিকে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা জাল বলে দাবি করেন। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও তিনি নাকচ করেন। পাশাপাশি প্রথম আলোর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি কল্যাণ ব্যানার্জির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অভিযোগ তোলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কল্যাণ ব্যানার্জির দুটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একটিতে সাড়া পাওয়া যায়নি এবং অন্যটি বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রেরণা এনজিওর আর্থিক লেনদেন, বিদেশি অনুদান, সম্পদের উৎস, নাগরিকত্ব ও ওয়ার্ক পারমিটের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এনজিওর নিবন্ধন বাতিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ক্রাইম বার্তা