আবু সাইদ বিশ্বাস: মৎসে বদলে গেছে সাতক্ষীরার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। সম্ভাবনার ‘হোয়াইট গোল্ড’ ও উদীয়মান কাঁকড়া শিল্প। একসময় যে লোনাপানি ও জলাবদ্ধতা ছিল মানুষের কাছে দুর্ভোগের কারণ, সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিকূলতাকেই কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে মৎস্য অর্থনীতি। আশির দশকের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ বিস্তারের পর গত কয়েক দশকে বদলে গেছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ত পানির আধিক্য দীর্ঘদিন ধরে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় আম্পান-আইলা আর লবণাক্ততার সঙ্গে নিত্য লড়াই উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার ২২ লাখ মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায়। চিংড়ির পাশাপাশি সাদা মাছ, কাঁকড়া ও কুচিয়া উৎপাদনও বাড়ছে জেলাতে। ঘেরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পোনা, খাদ্য, ওষুধ, জাল, বরফ, পরিবহন, আড়ত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবসা। ফলে মৎস্য খাত এখন শুধু ঘেরমালিকের আয়ের উৎস নয়; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
উদ্বৃত্ত মাছ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে: মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭১ হেক্টর জলাশয় ও জলাভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার বার্ষিক মাছের চাহিদা প্রায় ৫৪ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন। বিপরীতে উৎপাদন প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ৯৪ হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকে। এই উদ্বৃত্ত মাছ জেলার বাইরে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। চিংড়ি ও কাঁকড়ার একটি বড় অংশ আবার চলে যায় আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে সাতক্ষীরার মৎস্য খাত স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি জাতীয় বাজার ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও ভূমিকা রাখছে।
‘হোয়াইট গোল্ড’ বাগদা: সাতক্ষীরার মৎস্য অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপখাত বাগদা চিংড়ি। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫৪ হাজার ৯৩৫টি জলাশয়ে প্রায় ৫৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমিতে বাগদা চাষ হয়। বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ২৬ হাজার ২১৫ মেট্রিক টন। উৎপাদিত বাগদার বড় অংশ রপ্তানি হয় ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে। এ কারণেই চিংড়িকে বাংলাদেশের ‘হোয়াইট গোল্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। চিংড়ির রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
গলদায় বাড়ছে আগ্রহ: বাগদার পাশাপাশি মিঠাপানির গলদা চিংড়ি চাষেও আগ্রহ বাড়ছে। জেলার ১১ হাজার ৬৬২টি জলাশয়ে প্রায় ৯ হাজার ৩৮৯ হেক্টর জমিতে গলদা চাষের তথ্য রয়েছে। বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন। অনেক চাষি গলদার সঙ্গে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছের মিশ্র চাষ করছেন। এতে একই জলাশয় থেকে একাধিক প্রজাতির মাছ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং চাষির ঝুঁকিও কিছুটা কমছে। তবে গলদা চাষের বড় সীমাবদ্ধতা মানসম্মত রেণু পোনার সংকট। চাষিদের মতে, পর্যাপ্ত মানসম্মত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে গলদার উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
কাঁকড়ায় নতুন সম্ভাবনা: চিংড়ির পর সাতক্ষীরার উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কাঁকড়া। লবণাক্ততা, ভাইরাসের সংক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির কারণে অনেক চাষি বিকল্প হিসেবে কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৬৪টি কাঁকড়া ঘেরে প্রায় ৩২১ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৯৬৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদিত হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে কাঁকড়া রপ্তানি বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ। রপ্তানি বাজারের এই প্রবৃদ্ধি সাতক্ষীরার কাঁকড়া চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কাঁকড়া ভবিষ্যতে চিংড়ির বিকল্প রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার কাঁকড়া চাষি আব্দুস সাত্তার বলেন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় চাষিদের বড় ধরনের ঝুঁকি থাকে। চিংড়িতে ভাইরাসের আক্রমণ ও পোনা মারা যাওয়ার কারণে কয়েক বছর ধরে তিনি কাঁকড়া চাষ করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, তুলনামূলকভাবে কাঁকড়া চাষে লাভ ভালো এবং ঝুঁকিও কিছুটা কম। রপ্তানিতে বাড়ছে কাঁকড়ার অবদান: চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়াও এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় পণ্য।
মৎস্য ঘিরে কর্মসংস্থানের বিস্তার: সাতক্ষীরার মৎস্য খাতের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একজন ঘেরমালিকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন শ্রমিকেরা। আবার ঘেরের বাইরে পোনা ব্যবসায়ী, মাছের খাদ্য ও ওষুধ বিক্রেতা, জাল ব্যবসায়ী, বরফকল, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার, পাইকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এই অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। মাছ বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীদের অংশগ্রহণও রয়েছে। ফলে মৎস্য খাত পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৎস্য চাষকে টেকসই করতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনা, মিঠাপানি সংরক্ষণ এবং লবণাক্ততার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, ‘সাতক্ষীরা দেশের মৎস্য চাষে একটি মডেল জেলা। এখান থেকে উৎপাদিত চিংড়ির দুই-তৃতীয়াংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। আমরা মৎস্যচাষিদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি।’
কিন্তু সম্ভাবনার এই অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মানসম্মত পোনা উৎপাদন, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, উপকূলীয় বাঁধের সুরক্ষা, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পাশাপাশি পুশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৬/৮/২৬
ক্রাইম বার্তা