শ্যামনগরে খাল পুনঃখননে বদলে গেছে কুলতলীর কয়েক শত কৃষক পরিবারের জীবন

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় জনপদ মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী খাল পুনঃখননের পর বদলে গেছে কয়েক শত কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা। দীর্ঘদিন পলি জমে ভরাট ও দখলের কারণে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থায় সংকট থাকলেও খালটি পুনঃখননের পর সৃষ্টি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি সেচের সুযোগ বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি।

স্থানীয়রা জানান, কুলতলী খালটি মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী, ধানখালী ও জেলেখালী এলাকার কয়েক হাজার বিঘা কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। একসময় বর্ষা মৌসুমে খালটি পানিতে পূর্ণ থাকলেও পরবর্তী সময়ে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত সেচের সংকট।

খাল পুনঃখননের পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। খালের পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমেও কৃষিকাজের জন্য পানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি বাড়ছে ফসলের আবাদ।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষাণীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে খালের পানি ব্যবহার এবং মাছ ধরার সুযোগ ছিল সীমিত। খালটি পুনঃখনন ও অবমুক্ত করার পর স্থানীয়রা ছিপ দিয়ে দেশীয় মাছ ধরছেন। পরিবারের মাছের চাহিদার একটি অংশও পূরণ হচ্ছে খাল থেকে। পাশাপাশি বীজতলা তৈরি, সবজি চাষ ও অন্যান্য কৃষিকাজেও খালের পানি ব্যবহার করছেন তারা।

কৃষাণী পুষ্পারাণী ও মলিনা রানী বলেন, আগে খালটি ভরাট ও দখল হয়ে থাকায় পানি ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। মাছ ধরাও ছিল কঠিন। বর্তমানে খালটি উন্মুক্ত হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ব্যবহার এবং মাছ ধরতে পারছেন তারা।

স্থানীয় কৃষক উদয় মণ্ডল বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজ অনেকটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার পর খালে পানি না থাকলে সেচের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে মিঠা পানির সংকটও রয়েছে। খালে পানি ধরে রাখা গেলে সেচের খরচ কমবে এবং ফসলের আবাদ বাড়ানো সম্ভব হবে।

কৃষক সুবল মণ্ডল বলেন, দীর্ঘদিন খালটি দখল ও পলি জমে প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। পুনঃখননের পর খালটি দখলমুক্ত করে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করায় কয়েক হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

কৃষাণী টুম্পা রানী বলেন, খাল পুনঃখননের ফলে কুলতলী বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধতা থেকে অনেকটাই মুক্ত হয়েছে। খালের মিঠা পানি ব্যবহার করে স্থানীয়রা সবজি চাষ করছেন, মাছ ধরছেন এবং খালের পাড়ে গবাদিপশু পালন করছেন। শুষ্ক মৌসুমে খালের পানি কাজে লাগিয়ে শত শত বিঘা জমিতে ধান চাষের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, পানির সংকট ও জলাবদ্ধতা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় কৃষকরা জলবায়ু সহনশীল কৃষির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

খালের পানিকে কাজে লাগিয়ে বছরব্যাপী সবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খালে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও খালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

২৫ নম্বর মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোহাদেচ্ছুর রহমান বলেন, উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন বাড়ছে। এ বাস্তবতায় স্থানীয় খাল ও জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার করা কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় হারিয়ে যেতে বসা খাল পুনঃখননের ফলে পানি ধারণক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। এই পানি ঘিরে কৃষকের মাঠে নতুন ফসলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালী এলাকার একটি খালের কিছু অংশ এখনও দখলে রয়েছে। এতে ওই এলাকার কৃষকরা পানি নিষ্কাশন ও কৃষিকাজে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না। কৃষকদের দাবি, খালের দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করে পুরো খালটি জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করা হলে পানি নিষ্কাশন ও কৃষি উৎপাদন আরও বাড়বে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কুলতলীসহ উপকূলীয় এলাকার খালগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখা হলে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন, মিঠা পানি সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *