আবু সাইদ বিশ্বাস: নতুন পে-স্কেলে বাড়তে পারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, চাঙা হতে পারে অর্থনীতি বলে মত দিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের পাশা পাশি জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়তে পারে সরকারি সেবা, বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানো হলে তাঁদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করার কথা রয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেজ্ঞদের মতে, নতুন পে-স্কেলের সম্ভাব্য একটি ইতিবাচক প্রভাব হতে পারে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন। আর্থিক নিরাপত্তা বাড়লে কর্মীদের কর্মস্পৃহা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ার সুযোগ রয়েছে। ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছে, বেতন-ভাতা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে দুর্নীতির প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমলে ঘুষ বা অনৈতিক অতিরিক্ত আয়ের ওপর নির্ভরতার প্রবণতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দুর্নীতি কমাতে শুধু বেতন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল সেবা ও কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
নতুন বেতন কাঠামো মেধাবী ও দক্ষ তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো থাকলে দক্ষ জনবল সরকারি প্রশাসনে আকৃষ্ট করা এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখা সহজ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসেবার মানে পড়তে পারে।তবে পে-স্কেলের সুফল টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের আয় বাড়লেও বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পে-স্কেলের পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার তদারকি এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
সার্বিকভাবে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বাজারে চাহিদা সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নতুন বেতন কাঠামো দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
ক্রাইম বার্তা