শিক্ষক আছেন, স্কুল ভবনও আছে—নেই শুধু শিক্ষার্থী

স্কুল আছে, শিক্ষক আছেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীও শতাধিক। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও নেই। শিক্ষার্থীদের বদলে শ্রেণিকক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাগল। বেঞ্চে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র, কাদামাটি ও ময়লা-আবর্জনা; কোণে কোণে জমেছে মাকড়সার জাল। আর হোয়াইট বোর্ডে লেখা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পাঠের চিহ্ন। এরপর সেখানে আর কোনো ক্লাস হয়েছে কি না, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

অবাক করার মতো হলেও এমন চিত্রের দেখা মিলেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও সরেজমিনে কাউকে পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলছে। প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ও বন্ধ। তবে বাইরে জাতীয় পতাকা টাঙানো রয়েছে। শ্রেণিকক্ষগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, বেঞ্চগুলো এলোমেলো। শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা বেঞ্চ ও মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে ছাগলের মলমূত্র, জমে আছে কাদা। সেখানে ছাগলের অবাধ বিচরণ দেখে মনে হয়—বিদ্যালয়টি এখন ছাগলেরই আশ্রয়স্থল।

শ্রেণিকক্ষের হোয়াইট বোর্ডে ২০২৪ ও ২০২৫ সাল লেখা দেখে ধারণা করা হয়, সেই সময়ে শেষবারের মতো বোর্ডে কিছু লেখা হয়েছিল। চলতি বছর শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত কোনো ক্লাস হয়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টার পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন সহকারী শিক্ষক অনামিকা মৃর্ধা ও রতন লাল মিস্ত্রি। এত দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তারা তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্যদের ফোন করে সাংবাদিক আসার খবর দেন এবং দ্রুত স্কুলে আসতে বলেন।

শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো শিক্ষার্থী, ফাঁকা বেঞ্চের ওপর পড়ে রয়েছে ছাগলের মল ও ময়লা-আবর্জনা। ছবি : এশিয়া পোস্ট
শ্রেণিকক্ষে নেই কোনো শিক্ষার্থী, ফাঁকা বেঞ্চের ওপর পড়ে রয়েছে ছাগলের মল ও ময়লা-আবর্জনা।  

দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধা। তবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখা মেলেনি। সাংবাদিকেরা হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে জানান, হাজিরা খাতা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের বাড়িতে রয়েছে।

পরে তারা সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। এমনকি সহকারী শিক্ষক মো. হাসান মৃধাকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টাও করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমন দশা দীর্ঘদিনের। এলাকার কোনো শিশু-কিশোর এ স্কুলে পড়তে আসে না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিক ওরফে আবু বিভিন্ন এলাকার ঝরে পড়া বা পড়াশোনা না করা ছেলে-মেয়েদের টাকার বিনিময়ে খাতায় ভর্তি দেখান।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো অডিট বা পরিদর্শন কিংবা সরকারি অনুষ্ঠান থাকলে ঝালকাঠি সদর থেকে দুটি অটোরিকশায় করে টাকার বিনিময়ে ছেলে-মেয়েদের এনে শিক্ষার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এমনকি পরীক্ষার সময়ও বাইরে থেকে শিক্ষার্থী ভাড়া করে আনা হয়।

প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্য এ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে কর্মরত। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু মিলে নিজেদের পছন্দমতো কমিটি গঠন করে ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।

শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত না আসায় অনেক সময় সভাপতি মাসিক বেতনের শিটে স্বাক্ষর করতে চাননি। অভিযোগ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে বেতনের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

Magura

বর্তমানে বিদ্যালয়ের সভাপতি পদে রয়েছেন প্রধান শিক্ষকের ভাতিজা (বড় ভাই মনিরুজ্জামানের ছেলে) মিজানুর রহমান পারভেজ। স্থানীয়দের দাবি, সভাপতিও নিয়মিত স্কুলে আসেন না; বাড়িতে বসেই বিলে স্বাক্ষর করেন। আর এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আরাফাত ও আসমা বেগম জানান, কেবল পরীক্ষার সময় কিছু শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। বাকি সময় শ্রেণিকক্ষে কেবল ছাগলই থাকে। শিক্ষকেরাও প্রতিদিন আসেন না।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস জানান, ২০০৬ সালে তাকে সভাপতি করা হয়েছিল। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পরিদর্শনকালে অন্য স্কুল থেকে শিক্ষার্থী এনে বসিয়ে রাখা হতো। একদিন না জানিয়ে গিয়ে তিনি স্কুল তালাবদ্ধ দেখতে পান।

Untitled-1-Recovered  মিটিংয়ের রেজুলেশন তৈরি করা হয়। এরপর সরকারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান নেওয়া হয়, যা ২০০৮ সালে টাকা উত্তোলনের সময় ধরা পড়ে। এসব দুর্নীতি দেখে তিনি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরিপ্রসাদ পাল-এর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
বিদ্যালয়ের হোয়াইট বোর্ড। যেখানে এখনও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তারিখ ও পাঠের চিহ্ন। ছবি : এশিয়া পোস্ট
বিদ্যালয়ের হোয়াইট বোর্ড। যেখানে এখনও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তারিখ ও পাঠের চিহ্ন।  

একই অভিযোগ করেন রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত (তৎকালীন মঠবাড়ি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান) সভাপতি থাকা অবস্থায় তিনি দেখেন, কাগজে-কলমে নাম থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থী নেই। তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ায় আমাকে ব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি চেষ্টা করেও পরিস্থিতি বদলাতে না পেরে মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর আগেই ২০১৫ সালে পদত্যাগ করি।

বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ওরফে পারভেজের কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনার কাছে বলতে আমি বাধ্য না। আপনি আমার কাছে না বলে কেন স্কুলে গেছেন? বেতনের শিটে টাকার বিনিময়ে স্বাক্ষরের অভিযোগ বিষয়ে তিনি অশালীন মন্তব্য করে বলেন, আমার ডিসি আছে, শিক্ষা অফিসার আছে, তাদের কাছে বলব।

প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু শিক্ষার্থী না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। স্থানীয় ৪-৫ জন ছাড়া কেউ আসে না। তাই বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে ঝালকাঠি শহর থেকে দুইটি অটোরিকশায় শিক্ষার্থী এনে ক্লাস করানো হয়।

রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। সন্তোষজনক জবাব না মিললে এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *