৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় ২৮ কোটি

৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় ২৮ কোটি

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ইলেকট্রনিক চুক্তি ব্যবস্থাপনা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং টেকসই ক্রয় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নেওয়া ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৮০ শতাংশের বেশি রাখা হয়েছে পরামর্শক সেবার জন্য। প্রকল্পটির আওতায় একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ব্যক্তিভিত্তিক পরামর্শকের জন্য রাখা হয়েছে আরও ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দুই ধরনের পরামর্শক সেবায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

‘এলজিইডিতে ইলেকট্রনিক চুক্তি ব্যবস্থাপনা (ই-সিএমএস) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং টেকসই ক্রয় বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের তুলনায় পরামর্শক খাতের এই বরাদ্দ ৮০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পে ব্যয় করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৮১ টাকাই যাবে পরামর্শক সেবায়। বিপরীতে এলজিইডির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১২ লাখ টাকা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন এলজিইডি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পটির নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট ব্যয়ের মধ্যে রাজস্ব খাতে রাখা হয়েছে ৩১ কোটি ১৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এটি প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মূলধন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া ফিজিক্যাল ও প্রাইস কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে ভৌত ও মূল্য সমন্বয় খাতে রাখা হয়েছে ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

মূলধন ব্যয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হবে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনায়। প্রকল্পের আওতায় ১০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনার জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। ২২টি ইন্টার‌্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া বোর্ড কিনতে রাখা হয়েছে ৮৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া আটটি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক ল্যাপটপ সরবরাহে ১১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, অফিস সরঞ্জাম কেনায় ১৬ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র কেনায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

রাজস্ব খাতে প্রকল্পের জন্য দুটি যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি সম্মানী বাবদ ৩৫ লাখ টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৪ লাখ টাকা, বই ও সাময়িকী কেনায় ৩ লাখ টাকা এবং প্রকাশনায় ৫ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১২ লাখ টাকা।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটির জন্য ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে প্রায় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং মূলধন খাতে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রথম অর্থবছরেই মোট প্রকল্প ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, এলজিইডির ইলেকট্রনিক চুক্তি ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং টেকসই ক্রয় বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার বিষয়টিও প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত।

তবে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি পরামর্শক সেবায় রাখার বিষয়টি নজর কেড়েছে। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক সেবায় ২৪ কোটি ৪০ লাখ এবং ব্যক্তিভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে বরাদ্দ মাত্র ১২ লাখ টাকা। ফলে প্রকল্পটির মাধ্যমে এলজিইডির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা স্থায়ীভাবে বাড়বে, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রকল্প ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা হয়, পরামর্শকনির্ভরতার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না। এ প্রকল্পের নথিতে পরামর্শক সেবার জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ এবং প্রশিক্ষণে তুলনামূলকভাবে কম বরাদ্দ থাকায় সেই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে পরামর্শক সেবার আওতায় কী ধরনের কাজ, কতজন বিশেষজ্ঞ এবং কত সময়ের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে- এসব বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কী কারণে এ ব্যয় ধরা হয়েছে, তা এ মুহূর্তে তার জানা নেই। বিষয়টি জানতে রোববার দুপুরে তাকে ফোন দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। এ সময় তিনি ব্যস্ত থাকার কথাও জানান।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *