সাতক্ষীরায় ক্রেতা না থাকায় চামড়া ফেলে দিচ্ছে নদীতে

আবু সাইদ বিশ্বাস,সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা জেলার সর্বত্রই পবিত্র ঈদুল আযহায় কোরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষসহ মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনোভাবেই বিক্রি করতে না পেরে লোকসান আর দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে।
উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর এবং অন্যান্য উপজেলাতেও চামড়ার বাজারের এই একই করুণ চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ঈদের দিন সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদ্রাসার লোকজন। কিন্তু সংগ্রহকৃত চামড়ার ক্রেতা না পাওয়া যাওয়ায় অধিকাংশই অবিক্রীত থেকে যায়। পরে বাধ্য হয়ে অনেকেই তা ফেলে দেন কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলেন।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন থেকে সংগ্রহ করে আনা চামড়া শুক্রবার (২৯ মে) দুপুর পর্যন্ত শ্যামনগর উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। শুধু শ্যামনগর নয়, সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজার, তালা উপজেলা সদর এবং কলারোয়ার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চামড়া স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতা না থাকায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান।

সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার খলিলুর রহমান বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন দুটি ছাগল কুরবানি দিয়েছি। দাম নেই, নেওয়ার লোক নেই। সেজন্য কেটে পুকুরে দিয়ে দিয়েছি মাছের খাওয়ার জন্য।

সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার কোরবানি দাতা আলহাজ আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে কসাই দিয়ে গরুর চামড়া ছাড়ালাম। কিন্তু বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। ৫০ টাকা দিয়েও কেউ চামড়া নিতে রাজি হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেদের আঙিনায় গর্ত খুঁড়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন তালা উপজেলার ধানদিয়া গ্রামের কোরবানি দাতা শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “ছাগলের চামড়া তো কেউ ফ্রিতেও নিতে চাচ্ছে না। দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে তা খালের পাড়ে ফেলে দিতে হয়েছে।

প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের খরচের একটা বড়ো অংশ চালানো হয়। কিন্তু এবার চামড়ার বাজারে ধস নামায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে জেলার শত শত মাদ্রাসা ও এতিমখানা।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট জামে মসজিদের ইমাম ও বাগে জান্নাত হাফিজিয়া মাদ্রাসার খতিব হাফেজ রেজাউল করিম বলেন, সারাদিন ও সারারাত ভর অপেক্ষা করেও কেউ চামড়া নিতে আসেনি। পরে দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে মাদ্রাসা চত্বরেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।
একই অভিযোগ করেন গাবুরা চাঁদনীমূখা মাদ্রাসার সভাপতি মোঃ আবু মুছা। তিনি জানান, চামড়া বিক্রি না হওয়ায় এবার এতিম বাচ্চাদের ভরণপোষণের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চামড়ার বাজার সবচেয়ে খারাপ। আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনতে চাইছে।
সাতক্ষীরা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির কয়েকজন সদস্য জানান, সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, চলতি মওসুমে লবণের দাম অতিরিক্ত বেশি এবং পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ। সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আড়ত না থাকায় লোকসানের আশঙ্কায় তারা চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে মাঠপর্যায়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা মার্কেটিং অফিসার সালেহ মোঃ আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা চামড়ার বাজার মনিটরিং করছি। সরকার নির্ধারিত মূল্যে যাতে চামড়া কেনা-বেচা হয়, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে লবণের দাম ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে মাঠপর্যায়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দুজ্জামান কনক বলেন, কোরবানির আগে এতিমখানা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছিল তারা চামড়াগুলো সংরক্ষণ করে রাখবে। পরবর্তীতে দুই এক দিন পরে বিক্রি করার কথা। কিন্তু এভাবে নষ্ট করার কথা ছিল না। বিষয়টা আমি গুরুত্ব সহকারে দেখছি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: এফ এম মান্নান কবীর জানান, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া অবিক্রীত থেকে নষ্ট হওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সাথে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৯/৫/২৬

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *