আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: ইতিহাস, ঐতিহ্য, সুন্দরবন, সীমান্ত বাণিজ্য, কৃষি ও মৎস্য সম্পদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী একটি সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরা। দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জেলার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ এখনো স্বপ্ন দেখছে উন্নত, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় একটি সাতক্ষীরার। পরিকল্পিত উন্নয়ন, নদী পুনরুদ্ধার, পর্যটনের বিকাশ, ভোমরা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। জাতীয় সংসদে জেলার বর্তমান চার সংসদ সদস্যের উত্থাপিত দাবি ও প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। জেলার আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৮৫৮ বর্গকিলোমিটার। সাতটি উপজেলা, তিনটি পৌরসভা ও ৭৮টি ইউনিয়ন এবং ১,৪৩৬টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এ জেলায় কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা অধিকাংশ মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখানকার মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের অবস্থান এ জেলাতে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, কুমিরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এই বন। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন শুধু পর্যটনের জন্য নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বেষ্টনী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতি, কালিন্দী, খোলপেটুয়া, যমুনা ও মরিচ্চাপ নদী জেলার অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় এসব নদী ছিল যোগাযোগ, কৃষি ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। যদিও বর্তমানে অনেক নদী নাব্যতা সংকটে ভুগছে, তবুও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা এখনো জেলার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম বৃহৎ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা। ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত চিংড়ি জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। পাশাপাশি কাঁকড়া, মাছ ও মধু উৎপাদনেও জেলার সুনাম রয়েছে। এ ছাড়া আম, ধান, কুল,তরমুজ, পেয়ারা, নারকেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনেও সাতক্ষীরার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। ভোমরা স্থলবন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, যা জেলার অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এবিষয়ে জেলার চার সংসদ সদস্য জানান, দীর্ঘদিনের অবহেলা, অবকাঠামোগত সংকট, জলাবদ্ধতা, উপকূলীয় দুর্বলতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো তারা জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন । তাঁরা জেলার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মুহা. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা হলেও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সাতক্ষীরা-যশোর রেললাইন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে জেলার অর্থনীতি, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে তালা ও কলারোয়া অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নদী ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, রেললাইন প্রকল্প ও নদী পুনরুদ্ধারের বিষয়টি তিনি একাধিকবার সংসদে উত্থাপন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন।
সাতক্ষীরা-২ (সদর- দেবহাটা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, ভোমরা স্থলবন্দর দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবে বন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ভোমরা বন্দরের সম্প্রসারণ, আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থা এবং সংযোগ সড়কের উন্নয়ন করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পাশাপাশি সাতক্ষীরা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনেও বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভোমরা স্থলবন্দরের উন্নয়ন ও সাতক্ষীরা-যশোর রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি জাতীয় সংসদে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি- কালিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুহা. রবিউল বাশার বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষের প্রধান সমস্যা হলো দুর্বল বাঁধ, লবণাক্ততা এবং সুপেয় পানির সংকট। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। টেকসই উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় সাতক্ষীরার জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে সাতক্ষীরায়। পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং মৎস্য খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। একই সঙ্গে কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, কালিন্দীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদী পুনরুদ্ধারে বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সম্প্রসারণ, উপকূলীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নদী খননের বিষয়ে তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
জেলার উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে চার সংসদ সদস্যের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সম্ভাবনাময় সাতক্ষীরা আগামী দিনে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ও পর্যটন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৯/৬/২৬
০১৭১২৩৩৩২৯৯
ক্রাইম বার্তা