দুর্যোগ-দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে উপকূলের শিশু, বাড়ছে স্কুলছুট ও শিশুশ্রম

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা ও দাকোপে শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সংকটে পরিবারগুলো দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ছে। এর ফলে বাড়ছে শিশুশ্রম, ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী, হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো শিশুর শৈশব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২ অনুযায়ী দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শিশুশ্রমে এবং ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু শ্যামনগর উপজেলা থেকেই প্রতিবছর প্রায় লক্ষাধিক মানুষ মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার শিশু ইটভাটা ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হয়। অনেকেই আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না।

শিশুশ্রমের কারণে শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ক্ষেত্রেও ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে। ইটভাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থলে কাজ করা শিশুদের মধ্যে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, রক্তস্বল্পতা, ত্বকের রোগ, অপুষ্টি ও শারীরিক বিকলাঙ্গতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, বাল্যবিবাহ, শিশুপাচার এবং কিশোর অপরাধের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার উপকূলীয় এলাকায় কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, কর্মসৃজন প্রকল্প, বেড়িবাঁধ সংস্কার, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। শ্যামনগর, সাতক্ষীরা ও কালিগঞ্জে টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগও নিলেও তা অপ্রতুল।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বিশেষ ভাতা, আবাসিক কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের খাদ্য ও বাসস্থান সহায়তা, বিকল্প জীবিকা উন্নয়ন এবং শিশু সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।

অনুসন্ধান বলছে, স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকাশিত সর্বশেষ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (সিভিআই) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা খুলনার (সিভিআই ০ দশমিক ৫২), কয়রা (সিভিআই ০ দশমিক ৫৭) এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সাতক্ষীরা (সিভিআই ০ দশমিক ৫১) জেলার অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শ্যামনগর (সিভিআই ০ দশমিক ৫৮) ও আশাশুনি (সিভিআই ০ দশমিক ৫৫) উপজেলায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানি ও কর্মসংস্থান সংকটের কারণে ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে মানুষ। যার ফলে শৈশব হারাচ্ছে উপকূলের শিশুরা। সুযোগ পাচ্ছে না স্বাভাবিক বিকাশেরও। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে অকালেই। জীবনধারণের তাগিদে আট-নয় বছর বয়স থেকেই তারা কাজের জন্য ছুটছে ইটভাটায় বা যুক্ত হচ্ছে অন্য কোনো পেশায়।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবর এলেই উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলা, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলাসহ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চল থেকে হাজারো শিশু স্কুল-পরিবার পরিজন ছেড়ে কাজের খোঁজে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়। যাদের বেশির ভাগই ফিরে এসে আর স্কুলে যোগ দেয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাটার সর্দার জানান, ইটভাটায় এমন কিছু কিছু কাজ আছে, যেগুলো শিশুদের দিয়ে করালে খরচ কম হয়, তাই প্রতি ব্যাচ শ্রমিকদের সঙ্গে শিশুদেরও নেন তারা।

শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, গাবুরা থেকে প্রায় ১০ হাজার মানুষ ইটভাটায় কাজ করতে গেছে। এর মধ্যে ৮০০ এর মতো শিশু ও ১০০ এর মতো নারী রয়েছেন। এসব শিশুর জন্য পরিবারগুলো ভাটার শ্রমিক সর্দারদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে আগাম টাকা (দাদন) নিয়েছে। ভাটার সিজন এলে শিশুদের শ্রমিক সর্দারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এটা এখানকার মানুষের কাছে প্রচলিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ঠিক একই ধরনের কথা বলেন, শ্যামনগরের কৈখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম ও বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামও।

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *