মাদকের দাপটে বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরা: বাড়ছে অপরাধ, ভাঙছে পরিবার

আবু সাইদ বিশ্বাস: সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে। কর্মসংস্থানের সংকট, সীমান্তপথে চোরাচালানের ঝুঁকি, সহজলভ্য নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে জেলার একটি অংশের তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে বাড়ছে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ, চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের উদ্যোগে মাদকবিরোধী মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ এই উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান নয়, বরং মাদকের সরবরাহ চক্র ভেঙে দেওয়া, সীমান্তে নজরদারি জোরদার, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কজনিত রোগ। বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্তদের বড় অংশই তরুণ। বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সহজলভ্যতা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাতক্ষীরাকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার, নিয়মিত গোয়েন্দা অভিযান, মাদক মামলার দ্রুত বিচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কিশোর-তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণ এবং প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কার্যকর মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন জরুরি। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা সম্প্রসারণেরও প্রয়োজন রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে নিয়মিত ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট জব্দ হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, একটি চালান আটক হলেও এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় মাদক ব্যবসা পরিচালিত হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদকের অর্থায়ন, সরবরাহ চেইন, সীমান্তপথ, পাইকারি নেটওয়ার্ক এবং অর্থপাচারের উৎস শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারলেই কার্যকর পরিবর্তন আসতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানের পরও কিছু এলাকায় একই চক্র সক্রিয় থাকায় আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের দাবি, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে কোনো ধরনের দুর্বলতা, তথ্য ফাঁস বা অনিয়ম থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

গত কয়েক মাসে সাতক্ষীরা সদর, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি, তালা, কলারোয়া ও দেবহাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা মাদকবিরোধী কর্মসূচি পালন করেছেন। শহরের ৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানীয়রা বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করে কথিত মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের ঘোষণা দেন। অনেক এলাকায় প্রশাসনের কাছে কঠোর অভিযানের দাবিও জানানো হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, মাদকের বিস্তার শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক কলহ বাড়ছে, দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, সন্তানরা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে এবং অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। একই সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে মাদক একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে তারা মনে করেন

সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং মাদকবিরোধী অভিযান আরও কার্যকর হবে।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *