ধর্মান্ধতা ও অপসংস্কৃতির স্বরুপঃ গাজী নজরুল ইসলাম, এম.পি

 

ধর্মান্ধতা ও অপসংস্কৃতির স্বরুপঃ

গাজী নজরুল ইসলাম, এম.পি

ইদানীং একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা জনসম্মুখে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন— মানুষ দিন দিন ধর্মান্ধতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যিনি এই বক্তব্যটি দিয়েছেন, তিনি কেবল একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং কথাবার্তায় তাকে একজন আধুনিক, উচ্চশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান বলেই মনে হয়। কিন্তু “ধর্মান্ধ” শব্দটি সম্পর্কে তার কতটুকু গভীর জ্ঞান আছে, তা আমার জানা নেই। তিনি যদি শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও গভীরতা অনুধাবন করতে পারতেন, তবে বোধহয় লক্ষ লক্ষ জনগণকে ঢালাওভাবে এমন কথা বলতে গিয়ে কিছুটা সংযম বা সম্ভ্রমবোধ প্রকাশ করতেন।

আসুন প্রথমে দেখা যাক “ধর্মান্ধতা” সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কী বলেছে। মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন:

“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যেভাবে পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব।’ যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝতে পারেনি এবং তারা সৎপথেও পরিচালিত ছিলনা।”

— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭০)

আল-কুরআনে এই আয়াতের পাশাপাশি আরও অনেক আয়াত এসেছে, যেখানে পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এই নিন্দা সব ঐতিহ্য বা রীতিনীতির জন্য নয়; বরং কেবল সেই ঐতিহ্যের জন্য—যা চিরন্তন সত্যের পরিপন্থী। মূলত কুরআন অন্ধ ও যুক্তিহীন অনুকরণের নিন্দা করেছে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি আকিদা (বিশ্বাস) ও তাওহিদের (একত্ববাদ) সাথে সম্পর্কিত হয়।

সূরা আল-বাকারার ১৭০ নম্বর আয়াতটি মূলত তৎকালীন আরবের মুশরিক ও কুরাইশ কাফেরদের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছিল। তারা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করত এবং কোনো প্রকার অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই মহান আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে কথা বলত। এমনকি তাদের যখন আল-কুরআনের আলো ও সত্য পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হতো, তখন তারা তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করত। তারা সাফ জানিয়ে দিত—”না, আমরা কেবল তা-ই অনুসরণ করব, যার ওপর আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।” তারা তাদের বাপ-দাদা এবং তৎকালীন গোত্রপ্রধানদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে মূর্তি পূজা ও অন্যান্য প্রাচীন কুসংস্কারের ওপর অটল ছিল।

(তানতাবি, আত-তাফসিরুল ওয়াসাত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২১৩)

এই অন্ধ অনুকরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়; কারণ সব অনুকরণ কখনো ভালো হতে পারে না। আকিদা ও তাওহিদের বিষয়ে সঠিক জ্ঞান এবং বোধশক্তির অভাবে জাহেল (মূর্খ) পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করা মূলত সমাজ ও জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। পবিত্র কুরআনে তাই অন্ধ অনুকরণকারী, অহংকারী, একগুঁয়ে ও অসৎ মানসিকতার প্রতি কঠোর নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অন্ধ অনুকরণ মানবতাকে বিনাশের দিকে নিয়ে যায়—বিশেষ করে যখন পূর্বপুরুষেরা নিজেরাই চরম ভ্রান্তি ও কুফরির মধ্যে নিমজ্জিত থাকে।

মহান আল্লাহ পাক এই অন্ধ অনুকরণকারীদের করুণ অবস্থা বর্ণনা করে এর পরের আয়াতেই এরশাদ করেছেন:

“আর যারা কাফের হয়েছে তাদের উপমা সেই ব্যক্তির মতো, যে এমন কিছুকে ডাকছে যা কেবল হাঁকডাক আর চিৎকার ছাড়া আর কিছুই শোনে না। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; তাই তারা কিছুই বোঝে না।”

— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭১)

উপরের সামগ্রিক আলোচনা থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, যারা সত্যকে অবজ্ঞা করে এমন অন্ধ আনুগত্যে লিপ্ত, তারাই মূলত প্রকৃত ‘ধর্মান্ধ’। ফলে “ধর্মান্ধ” শব্দটি আসলে কাদের প্রতি প্রয়োগ করা উচিত, তা মহান আল্লাহর এই শ্বাশত বাণীর আলোকেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

এবার দেখা যাক, ‘ধর্মান্ধতা’ সম্পর্কে উইকিপিডিয়া কী বলে। ধর্মীয় অন্ধত্ব বা ধর্মান্ধতাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Religious Blindness’। এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:

“Religious or spiritual blindness typically refers to the inability to recognize divine truth, misinterpreting religious doctrine, or allowing rigid dogma to override reality and empathy.”

অর্থাৎ, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব বলতে সাধারণত ঐশ্বরিক সত্যকে উপলব্ধি করতে না পারা, ধর্মীয় মতবাদের ভুল ব্যাখ্যা করা অথবা বাস্তবতা ও সহানুভূতির ঊর্ধ্বে কঠোর গোঁড়ামিকে স্থান দেওয়াকে বোঝায়।

পূর্বের পর্যালোচনার সাথে উইকিপিডিয়ার এই সংজ্ঞার গভীর মিল রয়েছে। ধর্মান্ধতা হলো মূলত জাহেলি যুগের কুসংস্কার, গোঁড়ামি এবং পূর্বপুরুষ কিংবা নেতাদের অন্ধ অনুকরণ করা। পবিত্র কুরআনও বলছে, এরাই প্রকৃত ধর্মান্ধ। এরাই ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা ধারণ করে চলে।

এখন প্রশ্ন হলো, ওই অঞ্চলের মানুষ কি আসলেই জাহেলি যুগের ধর্মান্ধতায় আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ কোনো গোষ্ঠী, যাদের উদ্দেশ্যে এমন ঢালাও মন্তব্য করা যায়? নাকি তারা জাহেলি যুগের ধর্মীয় অন্ধত্ব ও গোঁড়ামিকে পরিহার করে মহান আল্লাহর শাশ্বত চিরন্তন বাণীকে মনে-প্রাণে ধারণ করেছে? তারা তো তাদের যাপিত জীবনকে মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর যোগ্য অনুসারীদের জীবনালোকের আদলে পরিচালনা করতে চায়। এই সত্য ও আলোর পথে চলার চেষ্টার কারণেই কি তারা ওই মন্তব্যকারীর কাছে ‘ধর্মান্ধ’ হিসেবে গণ্য হলেন?

এখন আসা যাক, ‘সংস্কৃতি’ বা ‘কালচার’ বলতে আমরা কী বুঝি? সংস্কৃতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:

“Culture encompasses the shared behaviors, beliefs, values, customs, and practices of a group. It serves as an invisible thread providing identity, religion, art, and social norms; it is continuously learned, adapted, and passed down through generations.”

অর্থাৎ, সংস্কৃতি হলো একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বমূলক আচরণ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা এবং অভ্যাসের সমষ্টি। এটি একটি অদৃশ্য সুতোর মতো কাজ করে, যা মানুষের পরিচয়, ধর্ম, শিল্পকলা এবং সামাজিক রীতিনীতিকে ধারণ করে। সংস্কৃতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা মানুষ ক্রমাগত শেখে, নিজের জীবনে গ্রহণ করে এবং তা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হতে থাকে।

সংস্কৃতির উক্ত ব্যাখ্যার আলোকে বলা যেতে পারে, আমাদের সংস্কৃতি কেবল ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ নয়, বরং এটি একটি ‘মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতি’। পৃথিবীতে প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর নিজস্ব ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। আমার চিন্তায়, এই মানবগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানত দুটি ধারা বিরাজমান—একটি হলো ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী এবং অন্যটি গোত্রীয় জাতিগোষ্ঠী। যেমন: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী। অনুরূপভাবে বাঙালি, ইংরেজ, আরব এবং অন্যান্য গোত্রীয় জাতিগোষ্ঠী।

এখানে বাঙালি গোত্রীয় বা জাতিগত পরিচয়টি প্রধানত দুটি বড় ধারায় বিভক্ত—একটি মুসলিম বাঙালি এবং অন্যটি হিন্দু বাঙালি। হিন্দু বাঙালিরা তাদের বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক তৃপ্তি লাভের চেষ্টা করে। তাদের যাপিত জীবনের সংস্কৃতিতে পোশাকের ক্ষেত্রে পুরুষদের ধুতি-পাঞ্জাবি এবং নারীদের শাড়ি পরার রেওয়াজ রয়েছে। বিবাহিত নারীদের হাতে শাঁখা এবং কপালে সিঁদুর পরার চল রয়েছে। এছাড়া এই গোষ্ঠীর নারীদের মধ্যে পর্দার মুসলিম শাস্ত্রীয় বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই; ফলে তারা সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী চুল খোলা রাখা বা অন্যান্য স্বাভাবিক পোশাকে যাপিত জীবনের সব ক্ষেত্রে চলাফেরা করতে পছন্দ করেন এবং এটিকে তাদের সংস্কৃতির অংশ মনে করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে তারা মূর্তিপূজা করেন, নিজেদের তৈরি মাটির বা পাথরের দেব-দেবীর চরণে অর্ঘ্য ও নৈবেদ্য নিবেদন করেন। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস একাধিক ধর্মগ্রন্থ, যেমন—বেদ ও গীতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অপরপক্ষে, মুসলিম বাঙালিরা একমাত্র লা-শরিক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী। তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে শেষ নবী হিসেবে মান্য করে এবং তাঁরই আদর্শ অনুসরণ করে চলে। তারা একমাত্র নিরাকার আল্লাহর দরবারে সিজদা করে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে ব্রতী থাকে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে তারা জীবনের একমাত্র শাশ্বত বিধান হিসেবে বিশ্বাস করে।

পোশাক ও যাপিত জীবনের সংস্কৃতিতে মুসলিম বাঙালি পুরুষদের মাঝে সাধারণত লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবি, টুপি, পিরহান, জুব্বা, কাঁধে রুমাল ও হাতে তসবীহ রাখার রেওয়াজ দেখা যায়। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের পোশাকের সংস্কৃতিতে রয়েছে শাড়ি, ওড়না, বোরকা, হিজাব বা হাত-মুখ ও চুল ঢেকে রাখার পর্দা প্রথা। তাদের সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—তারা হাতে কখনো সনাতন ধর্মীয় শাঁখা পরেন না এবং কপালে কখনো সিঁদুর দেন না। এটিই তাদের সংস্কৃতির স্বতন্ত্র পরিচয়।

অনুরূপভাবে, বিশ্বের অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের মাঝেও এই ধর্মীয় সংস্কৃতির পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়। যেমন—হিন্দি ভাষাভাষী হিন্দু জনগোষ্ঠী তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পোশাকে সনাতন ভাবধারা বজায় রাখে। আবার একই অঞ্চলের হিন্দি বা অন্য ভাষাভাষী মুসলিমদের আচার-আচরণ ও পোশাকে সুস্পষ্টভাবে ইসলামি ভাবধারা প্রকাশ পায়। ঠিক একইভাবে, ইংরেজ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও পোশাকের সংস্কৃতি যেমন একরকম, তেমনি ইংরেজ বংশোদ্ভূত মুসলিমদের জীবনযাত্রায় ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাব বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান। তদ্রূপ, আরবি ভাষাভাষী মুসলিম নর-নারীদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল সংস্কৃতি এক হলেও, ভৌগোলিক কারণে পোশাকের সংস্কৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়; তবে তা কোনোক্রমেই ইসলামি সংস্কৃতির শালীনতার বাইরে নয়।

পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাভাষী অমুসলিমদের ধর্মীয় চর্চা ও পোশাকের সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর নর-নারীদের পোশাকে ভৌগোলিক কারণে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও, তা অবশ্যই ইসলামি শালীনতার কাঠামোর বাইরে নয়। পোশাকের এই সামান্য ভিন্নতা সত্ত্বেও ধর্মীয় সংস্কৃতির মূল জায়গায় তারা সবাই এক—তারা সবাই এক আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহর প্রতি অনুগত।

এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় আচরণ ও পোশাকের সংস্কৃতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলেও, মূলত বিভিন্ন ভাষাভাষী বা ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ব্যাপকতা আরও অনেক গভীরে বিস্তৃত। যেমন: খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সংগীত, সাহিত্য, কৃষ্টি-কালচার, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, পরিবারনীতি ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও ভাষাভাষী গোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলিম জাতিগোষ্ঠী যেকোনো ভাষা বা অঞ্চলেরই হোক না কেন—তাদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সংগীত, সাহিত্য, কৃষ্টি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি এবং পরিবারনীতিসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ইসলামি ভাবধারা সর্বদাই সুস্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়।

উপমহাদেশে মোগল আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুগেই মুসলিম জাতিসত্তা এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচরণ, পোশাক ও সামগ্রিক সংস্কৃতি মূলত একই মূল ভাবধারায় পরিচালিত হয়ে আসছে। পক্ষান্তরে, এই উপমহাদেশে বসবাসকারী অমুসলিম ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচরণ, পোশাক এবং যাপিত জীবনের সংস্কৃতিতে প্রায়শই ভিন্ন ভিন্ন রূপ, রঙ ও ভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। বিশেষ করে শ্লীলতা-অশ্লীলতা, নগ্নতা কিংবা অর্ধ-নগ্নতা এবং পোশাকের মাধ্যমে দৈহিক প্রদর্শন বা অপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের চলন-বলন ও জীবনধারা মুসলিম ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।

আমরা এই প্রবন্ধের মাঝামাঝি পর্যায়ে সংস্কৃতির যে সংজ্ঞা আলোচনা করেছি, তা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে—সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীর জীবনব্যবস্থার সামগ্রিক রূপ বা ধারা। এটি মূলত সেই সমাজের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, শিল্পকলা, আচার-আচরণ এবং ঐতিহ্যের একটি সামগ্রিক সমষ্টি। এই সংস্কৃতিই বংশ ও প্রজন্ম পরম্পরায় স্ব-স্ব জাতিগোষ্ঠীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে রূপ দেয় এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বাহিত হতে থাকে। এখান থেকে আরও জানা যায় যে—যেকোনো ধর্ম কিংবা ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় ভাবধারা, সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ব্যবহারিক দিক, পোশাকের শালীনতা বা প্রদর্শনপ্রবণতা, রূপচর্চা, শরীরচর্চা, ক্রীড়া, সাহিত্য, সংগীত, কৃষ্টি-কালচার, রাজনীতি, সমাজনীতি এবং পরিবারনীতি ঠিক কেমন অবস্থানে রয়েছে। মূলত এই সব আচার-আচরণ দেখেই দুনিয়াতে চেনা যায়—কারা কোন জাতির, কোন গোষ্ঠীর বা কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।

এখানে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, আমরা মূলত ধর্মীয় পরিচয়ে ‘মুসলিম’ এবং ভাষাগত দিক থেকে ‘বাঙালি’। আমাদের দেশে কিংবা এই উপমহাদেশে একটি বিশেষ শ্রেণী বাঙালির ‘হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ খুঁজতে গিয়ে বড্ড হয়রান ও পেরেশান হয়ে পড়ে। অথচ এখানে এত পেরেশান হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা সংস্কৃতি পর্যালোচনা করলে সহজেই দেখা যায়—এই উপমহাদেশে হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতি এক প্রকার, আর মুসলিম বাঙালির সংস্কৃতি অন্য প্রকার। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই সংস্কৃতি সম্পূর্ণ (Absolutely) আলাদা। তবে তাদের যাপিত জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমিল থাকলেও, কিছু কিছু পেশাগত বা সামাজিক ক্ষেত্রে কিছুটা সামঞ্জস্য বা মিল দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক হিন্দু বাঙালি আইনজীবী বিচারালয়ে যে কালো কোট, গাউন বা পরিধেয় বস্ত্র পরিধান করেন; মুসলিম বাঙালি আইনজীবীরাও আদালতে প্রায় একই পোশাক পরেন। আবার ব্রিটিশ আমলের ইংরেজ আইনজীবীরাও আদালতে ঠিক এই একই ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। অর্থাৎ, এটি ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়, বরং একটি পেশাগত অভিন্ন রূপ।

যাপিত জীবনে হিন্দু বাঙালিরা যেমন লুঙ্গি, পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরেন; অপরপক্ষে মুসলিম বাঙালিরাও তাদের দৈনন্দিন জীবনে লুঙ্গি, পায়জামা কিংবা পাঞ্জাবি পরিধান করে থাকেন। আবার হিন্দু বাঙালিরা শার্ট-প্যান্ট পরেন, মুসলিম বাঙালিরাও শার্ট-প্যান্ট পরেন। এই বাহ্যিক মিলগুলো এ কারণেই সম্ভব হয়েছে যে, পোশাকের এই ক্ষেত্রগুলোতে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাকে যদি আমরা খুব সূক্ষ্ম বা কট্টরভাবে না দেখি, তবে এখানে কোনো কৃত্রিম ভিন্নতা তৈরির প্রয়োজন পড়ে না।

তবে আধুনিককালে বাংলা বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে যে ‘তেলেসমাতি’ ও প্রহসনের সৃষ্টি করা হয়েছে—যার মাধ্যমে একটি অতি-উৎসাহী গোষ্ঠী সমগ্র বাঙালি জাতিকে একটি নির্দিষ্ট ভিনদেশী ভাবধারা ও মূল্যবোধের দিকে ঠেলে দিতে চায়—তা নিতান্তই দুঃখজনক, লজ্জাজনক, অস্বস্তিকর এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইতিহাস ঘেঁটে যতদূর জানা যায়, বাংলা বর্ষবরণ বা বাংলা সন গণনা শুরু হয়েছিল ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে, মুসলিম মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। ওই সময়ে মুসলিমদের যুদ্ধবিজয়ের একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিগাথাকে স্মরণীয় রাখার পাশাপাশি এর সাথে জড়িত ছিল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক বিষয়। বাংলা বছরের প্রথম দিনে সমগ্র রাজ্যের খাজনা আদায় এবং ব্যবসায়ীদের বকেয়া আদায়ের নিমিত্তে ‘হালখাতা’ ও মিষ্টিমুখ করানোই ছিল এই উৎসবের প্রধানতম প্রতিপাদ্য বিষয়। বছরের শুরুতে উৎপাদিত ফসলের খাজনা আদায়ের বিধান চালু হওয়ায় এটি শুরুতে ‘ফসলি সন’ বা খাজনা সন হিসেবেও আখ্যায়িত হতো। এর সাথে কোনো পৌত্তলিক আচার বা মূর্তির সংস্কৃতির দূরতম কোনো সম্পর্কও ছিল না।

প্রবন্ধের প্রারম্ভিক প্রস্তাবনায় উল্লিখিত “ধর্মান্ধতা” এবং “সংস্কৃতির স্বরূপ” উন্মোচনের চিত্র আমরা এই সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যায় পর্যালোচনা করেছি। সামগ্রিক পর্যালোচনায় এটিই সুস্পষ্ট যে—ধর্মান্ধতা হলো মূলত জাহেলিয়াত যুগের পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস, গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে কোনো যুক্তি ছাড়া অন্ধভাবে মান্য করা। আর সংস্কৃতি হলো এমন এক আবরণ, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘আইডেন্টিফাই’ বা শনাক্ত করা যায় যে, সে কোন ধর্মের এবং কোন জাতিগোষ্ঠীর ধারক ও বাহক। এখানে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসই থাকে এক নম্বরে; যা তার দৈহিক, মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ পায়। আর এই মানদণ্ডেই আমরা সহজে বুঝতে পারি—কোন ব্যক্তি মুসলিম, কোন ব্যক্তি পৌত্তলিক, কোন ব্যক্তি নাসারা (খ্রিষ্টান) কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

এই প্রবন্ধে আলোচিত ‘ধর্মান্ধতা’ এবং ‘সংস্কৃতির স্বরূপ’ উন্মোচনে যে বাস্তব চিত্রটি পরিস্ফূটিত হয়েছে, তাতে এই মন্তব্য করলে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে—কোনো আগন্তুক নাগরিক (বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তি) যদি কোনো জনগোষ্ঠীর শাশ্বত যাপিত জীবনাচরণ নিয়ে বিরূপ কটাক্ষ বা অবমাননাকর মন্তব্য করেন, তবেই সত্য শেষ হয়ে যায় না। বরং, সেই অযাচিত ও অবিবেচকমূলক মন্তব্যটি একসময় তাঁর নিজের দিকেই ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরে আসে। ওই মন্তব্যকারীর নিজস্ব ধর্মাচরণ কি আসলে গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন, নাকি তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনাচরণ কোনো অপসংস্কৃতির ছায়া-আবরণে ঢাকা—তা ওই ব্যক্তির চাক্ষুষ জীবনধারা ও আচরণের মাধ্যমেই সমাজে সর্বদাই সুস্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়।

পরিশেষে, ধর্মান্ধতার প্রকৃত স্বরূপ চেনার এই আলোচনায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত ও কালজয়ী উক্তিটি স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে তিনি দীপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন:

“ধর্মান্ধরা শোনো,

অপরের পাপ গুনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!”

 

লেখক গাজী নজরুল ইসলাম, এম.পি সাতক্ষীরা ৪ শ্যামনগর

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *