একটি বরই গাছ, একটি ছোট ঘর আর অসংখ্য স্মৃতি—এই ছিল ছাহেরা খাতুনের(৬৫) সংসার। প্রায় ২০ বছর আগে সেই সংসার ছেড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় কোথায় গেছেন, কোথায় আছেন—কেউ জানত না। স্বামী ঈমান আলী(৭৫) ও পাঁচ সন্তান দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছেন। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি।
দিন, মাস, বছর পেরিয়ে গেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুই দশক। জীবন থেমে থাকেনি, কিন্তু স্ত্রীকে হারানোর শূন্যতাটি থেকে গেছে ঈমান আলীর মনে।
অবশেষে সেই অপেক্ষার যেন শেষ হলো গত ১৯ সেপ্টেম্বর। নিজের বাড়ির পাশেই এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে দেখতে পান স্থানীয়রা। তিনি এসেছিলেন একটি চায়ের দোকানে পান খেতে। প্রথমে কেউ তাকে চিনতে পারেননি। রাত হয়ে গেলে তিনি আশ্রয় নেন চায়ের দোকানের পাশের একটি দোকানের বারান্দায়।
স্থানীয়দের সন্দেহ হওয়ায় খবর দেওয়া হয় ঈমান আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের। খবর পেয়ে ছুটে আসেন ঈমান আলী ও তার বড় মেয়ে জামেলা বেগম। সামনে গিয়ে ওই নারীকে দেখেই যেন থমকে যান তারা। দীর্ঘ ২০ বছর পর যে মুখটি দেখলেন, সেটি আর কারও নয়—ঈমান আলীর হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী আর জামেলার মা ছাহেরা খাতুন।
সখীপুর-ঘাটাইল উপজেলার সীমান্তবর্তী ফুলমালিরচালা এলাকায় ঈমান আলীর (৭৫) বাড়ি। কৃষিকাজ করে সংসার চালান। স্ত্রী ছাহেরা খাতুনকে হারানোর পর দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে কেটে গেছে তার দীর্ঘ জীবন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাহেরা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে মির্জাপুর ও সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় যেখানে যা পেতেন তাই খেতেন, কখনো যেখানে জায়গা মিলত সেখানেই থাকতেন। মানুষের সঙ্গে খুব একটা কথাও বলতেন না।
কিন্তু স্মৃতি যেন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বাড়িতে ফিরে ছাহেরা খাতুনের মনে পড়ে সেই পুরোনো বাড়ির কথা। তিনি বলেন, সেখানে একটি বরই গাছ ছিল, একটি ছোট ঘর ছিল। সেই ঘরটিও এখনো রয়েছে।
দুই দশক পর স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে ঈমান আলীর চোখে-মুখে স্বস্তি। পাঁচ সন্তানও যেন ফিরে পেয়েছেন হারানো মাকে।
ঈমান আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে হলেও আমি আমার স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছি। আমার পাঁচ সন্তানও খুব খুশি হয়েছে। আমিও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।’
মেয়ে জামেলা বেগম বলেন, মা হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছি। এই ২০ বছর কীভাবে কাটিয়েছি, কত কষ্টে কাটিয়েছি—জানি না। আল্লাহ আমার মাকে আবার আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমরা সবাই খুবই খুশি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসান বলেন, এটি আল্লাহর একটি রহমত। মানুষ হারিয়ে যায় শুনেছি, কিন্তু ২০ বছর পর এভাবে ফিরে আসার ঘটনা আমি আজ প্রথম দেখলাম।
ছাহেরা খাতুন ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করতে শুরু করেন স্থানীয় মানুষ। কেউ বিস্মিত, কেউ আবেগাপ্লুত—দুই দশক পর হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ এভাবেই ফিরে আসতে পারেন, যেন বিশ্বাস করতেই পারছেন না কেউ।
মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ছাহেরা খাতুন এখনো কারও সঙ্গে তেমন কথা বলছেন না। তবে তার ফিরে আসায় সবচেয়ে বড় পাওয়া ঈমান আলী ও তার পাঁচ সন্তানের—দুই দশকের অপেক্ষার পর অন্তত তারা আবার ফিরে পেয়েছেন তাদের আপন মানুষটিকে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় ইউপি সদস্য ওয়াজ উদ্দিন বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে ছাহেরা খাতুন নিখোঁজ হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন পর বাড়ির পাশ থেকে তাকে ফিরে পাওয়ার ঘটনা সত্যিই আনন্দের। পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ক্রাইম বার্তা