ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সাতক্ষীরা আদালত এলাকা চাঁদাবাজি, হয়রানি ও ঘুষের অভিযোগ; বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোটার: বিচারপ্রার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা আদালত প্রাঙ্গণ। কিন্তু সাতক্ষীরা আদালত এলাকায় চাঁদাবাজি, হয়রানি এবং ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ার নানা অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আদালতে হাজিরা দিতে আসা কয়েকজন বিচারপ্রার্থীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দপ্তরে কাজের বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আদালতের একাধিক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হন। পরে মামলার ধার্য দিনে হাজিরা দিতে এলে তাঁদের কয়েকজনকে আদালত চত্বর থেকে কৌশলে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর প্রধান সড়কসংলগ্ন একটি বেকারি ও কনফেকশনারিতে নিয়ে গাড়িতে তুলে অন্যত্র আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।

আইনজীবীদের ভাষ্য, আটকে রাখার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোন করিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা, উপজেলা পর্যায়ের এক রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং এক শ্রমিক সংগঠনের নেতার কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। টাকা পাওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

প্রায় দেড় মাস আগে আদালত চত্বরের ভেতরের পার্কের দক্ষিণ পাশ থেকে কালীগঞ্জের এক বিচারপ্রার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাঁকে মারধর করা হয়। এতে তাঁর হাত-পা ভেঙে যায় বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকেও প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের পর কয়েকজন বিচারপ্রার্থী পুনরায় আদালতে গেলে আটক বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন। এ কারণে কেউ কেউ সশরীরে হাজির না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, আশাশুনি ও কালীগঞ্জের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আদালতে আসা আরও কয়েকজন বিচারপ্রার্থী একই ধরনের ভয়ভীতি ও অর্থ দাবির কথা জানিয়েছেন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে উমেদারমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত প্রায় ৪৯ জন উমেদার বা অনিবন্ধিত সহকারীর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদালত সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সেবা পাবেন। তবে উমেদারদের কার্যক্রম বন্ধের পরও বিভিন্ন দপ্তরে প্রকাশ্যে ঘুষ বা উপঢৌকন দাবি এবং টাকা ছাড়া কাজ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন বিচারপ্রার্থীর ভাষ্য, আগের মতোই নানা কাজে বাড়তি অর্থের দাবি করা হচ্ছে। ফলে উমেদারমুক্ত করার উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাতক্ষীরা জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আকবর আলী বলেন, বিষয়টি শুনে তিনি উদ্বিগ্ন। আদালতে গিয়ে ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহীদুর রহমান বলেন, এ ধরনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি জানার পর খোঁজখবর নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে আদালত এলাকায় রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নেতা-কর্মীদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের দাবি, আদালত এলাকায় ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, সন্দেহভাজনদের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার করা জরুরি। তাঁদের মতে, আদালতে ন্যায়বিচারের আশায় আসা মানুষ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
৫/১০/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *