সাতক্ষীরায় কলেজ ছাত্র হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি তার সহযোগী আটক পুলিশ বলছে এ খুন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’, পরিবারের দাবী পরিকল্পিত খুন

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা:
সাতক্ষীরায় বহুল আলোচিত কলেজছাত্র জাকারিয়া খান হত্যাকান্ডে মামলার প্রধান আসামি নাহিদ হাসান ও তার সহযোগী অমিত হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে ভারতের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শুইলপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। সাতক্ষীরা সদর থানা, কালিগঞ্জ থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ দল ভোর ৪টার দিকে সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশের দাবি, নাহিদ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর আগে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুহিদ হাসান বনিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে জাকারিয়া হত্যার ঘটনায় সদর থানার ওসির বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার। মামলার বাদী ও নিহতের ভাই শাহরিয়ার খানের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করা আসামিদের দায়কে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা। তার দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা হয়েছে। ফলে তদন্তের শুরুতেই ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে অভিহিত করা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মামলার প্রধান আসামি নাহিদ হাসান স্থানীয় যুবলীগের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া মুহিদ হাসান বনি স্থানীয় ছাত্রলীগের ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন। স্থানীয়দের আরও দাবি, নাহিদ ও বনির এক চাচা বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা। তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। জাকারিয়া হত্যার রাতেও তারা যুবদলের একটি কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বলে সদর থানার ওসি জানান।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাহিদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বকচরা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. রমজান আলীকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ, চলতি বছরের এপ্রিলে শহরের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আজিজুল ইসলামকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগসহ আরও কয়েকটি মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে।
গত ২ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে একটি চায়ের দোকানের সামনে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চায়ের দোকানের মালিক রবিউল ইসলামের ভাইপো বাপ্পি হাসানের সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে মারামারি শুরু হলে বাপ্পিকে রক্ষা করতে গিয়ে জাকারিয়া ছুরিকাঘাতের শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় জাকারিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহতের ভাই ও মামলার বাদী শাহরিয়ার খানের দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখেই মামলায় আসামিদের নাম দেওয়া হয়েছে।
জাকারিয়া হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ মিছিল করেছেন তার সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’, ‘ফাঁসি চাই’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’—এমন স্লোগান দেন। মানববন্ধনে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল হাশেম, সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বাসুদেব বসু, জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাতক্ষীরার আহ্বায়ক আরাফাত হোসাইন, কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাসুদুল আলম, নিহতের বড় ভাই শাহরিয়ার খান ও ফুফাতো ভাই তামিম বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, জাকারিয়া ছিলেন একজন কলেজশিক্ষার্থী। তার সামনে ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু সহিংসতার ঘটনায় তাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে নিহতের বড় ভাই শাহরিয়ার খান বলেন, তার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চান। তিনি বলেন, হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় না এনে আইনের আওতায় আনতে হবে।
একদিকে পুলিশ বলছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। অন্যদিকে নিহতের পরিবার ও শিক্ষার্থীদের দাবি, ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ নেই।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *