আর্সেনিকের বিষে নিঃস্ব কৃষ্ণকাটি, একে একে নিভছে প্রাণ

আর্সেনিকে বিপন্ন সাতক্ষীরার জনজীবন
# শুধু একটি গ্রামেই দেড় দশকে শতাধিক মৃত্যু!
# পানির সঙ্গে বিষ, কৃষ্ণকাটিতে ঘরে ঘরে স্বজন হারানোর কান্না

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা:
আর্সেনিকে বিপন্ন তালার কৃষ্ণকাটির জনজীবন। গত দেড় দশকে এখানে আর্সেনিকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। মৃত্তিকা বিশেজ্ঞরা জানান, সাতক্ষীরা গঙ্গা বদ্বীপের অংশ হওয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে নদীবাহিত পলি, বালু ও কাদামাটি জমে এখানকার ভূস্তর গঠিত হয়েছে। প্রাচীন সামুদ্রিক প্রভাবের কারণে ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরে লবণাক্ত পানি আটকে রয়েছে। আবার কোথাও অগভীর স্তরে মিঠাপানি পাওয়া গেলেও ভূগর্ভস্থ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কারণে তাতে অতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিক থাকতে পারে। গভীর নলকূপের পানিও অনেক এলাকায় প্রাচীন লবণাক্ত পানির উপস্থিতি ও বিভিন্ন স্তরের পানির মিশ্রণের কারণে লবণাক্ত হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক পরিবেশ বদলে আর্সেনিকের ঝুঁকি কিছু এলাকায় আরও বাড়াতে পারে। পাশাপাশি নিরাপদ মিঠাপানির সংকটে মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই শুধু গভীর নলকূপ স্থাপন নয়, ভূতাত্ত্বিক গঠন ও পানির গুণগত মান যাচাই করে টেকসই সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।’

একসময় যে বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করতেন আনছার মোড়ল, সেই বাড়িতে এখন আর কেউ থাকেন না। পরিবারে পুরুষ সদস্যদের কেউ নেই। বাড়ির উঠানে মানুষের আনাগোনা নেই। নেই শিশুদের ছোটাছুটি। বসতভিটাটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কয়েক বছরের ব্যবধানে আনছার মোড়লসহ পরিবারের সাত পুরুষ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তারা সবাই আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র পুত্রবধূ দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। একসময় একটি পরিবারের আশ্রয়স্থল হয়ে থাকা বাড়িটি এখন গ্রামের মানুষের কাছে আর্সেনিকের ভয়াবহতার এক করুণ চিহ্ন। বাড়িটি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামে। আনছার মোড়লের পরিবারের এমন পরিণতি এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে স্বজন হারানোর গল্প। কোনো পরিবার হারিয়েছে উপার্জনক্ষম সদস্যকে, কোনো পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ একাধিক মানুষ।

আনছার মোড়লের পরিত্যক্ত বাড়ির পাশেই থাকেন শফিকুল ইসলাম। তার জীবনেও আর্সেনিকের প্রভাব রেখে গেছে গভীর ক্ষত। গত এক দশকে বাবা, মা, চাচা ও স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি। শফিকুলের দাবি, তাদের মৃত্যু হয়েছে আর্সেনিকজনিত ক্যানসারে। যে রোগে স্বজনদের হারিয়েছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন, সেই আর্সেনিকজনিত জটিল চর্মরোগের উপসর্গ এখন নিজের শরীরেও বহন করছেন। একসময় পরিবারের সদস্যদের অসুস্থ হতে দেখেছেন শফিকুল। তাদের চিকিৎসা ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতার পর এখন নিজের শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় তার উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পরিবারের মানুষগুলোর অনুপস্থিতি প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় সেই দুঃসময়ের কথা। নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, সেই অনিশ্চয়তাও তাকে তাড়া করে।

কৃষ্ণকাটি আটঘরার বিভিন্ন বাড়িতে গেলে এমন আরও অনেক মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। কারও হাত-পায়ের চামড়া অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে গেছে, কারও শরীরের বিভিন্ন অংশে কালো দাগ, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন। আক্রান্তদের অনেকে বছরের পর বছর চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ স্থানীয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, কেউ অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে যাচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেকে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে প্রথম কৃষ্ণকাটি আটঘরা গ্রামের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। তখন থেকেই পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে পানির নমুনা পরীক্ষায় গ্রামের ৯২ শতাংশের বেশি নলকূপের পানি আর্সেনিক দূষিত পাওয়া যায় বলে দাবি স্থানীয়দের। ওই পরীক্ষার পর দূষিত নলকূপের পানি পান ও ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিকল্প হিসেবে পুকুরের পানি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নিরাপদ পানির পর্যাপ্ত উৎস না থাকা, সচেতনতার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পানি ব্যবহার অব্যাহত রাখেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, কৃষ্ণকাটি আটঘরা আর্সেনিক আক্রান্ত গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠায় অন্য এলাকার অনেক পরিবার এখানে ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহ দেখায় না। আবার গ্রামের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় অভিভাবকদের। কোনো ব্যক্তির হাতে-পায়ে আর্সেনিকজনিত চর্মরোগের দৃশ্যমান লক্ষণ থাকলে সামাজিক অনুষ্ঠানে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে জানিয়েছেন আক্রান্তরা। হাট-বাজারেও তাদের অনেককে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। রোগের চিকিৎসা করানোর পাশাপাশি তাই নিজেদের সামাজিক পরিচয় নিয়েও সংকটে পড়তে হচ্ছে গ্রামের মানুষকে।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু জানান, শুধু কৃষ্ণকাটি আটঘরা নয়, ইউনিয়নের আরও কয়েকটি গ্রামের নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য প্রায় এক হাজার পানির ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে। তবে ট্যাংক বিতরণের পরও কৃষ্ণকাটি আটঘরার নিরাপদ পানির সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। এত মানুষের পানির চাহিদা মেটাতে বর্তমানে একটি গভীর নলকূপই প্রধান ভরসা।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সাইফুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার ফলে ত্বকের বিভিন্ন পরিবর্তনসহ জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। আর্সেনিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। আর্সেনিকোসিসের নির্দিষ্ট কোনো নিরাময়মূলক চিকিৎসা না থাকলেও আক্রান্তদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে সমস্যা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তার মতে, চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্সেনিকযুক্ত পানি পান বন্ধ করা। দূষিত পানির সংস্পর্শ অব্যাহত থাকলে চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়।

অন্যদিকে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, জেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীদের জন্য বর্তমানে বিশেষ কোনো চিকিৎসা কর্মসূচি চালু নেই। সরকারিভাবে তাদের জন্য আলাদা ওষুধ কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই। তিনি জানান, কোনো এলাকায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করতে এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা থাকায় সেখান থেকেও প্রত্যাশিতভাবে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতিতে গ্রামের বাইরে অন্য কোনো নিরাপদ উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষ্ণকাটি আটঘরায় সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদ পারভেজ জানান, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও লবণাক্ততার সমস্যা থাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্য এলাকা থেকে সুপেয় পানি এনে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আরও জানান, আর্সেনিকযুক্ত পানি উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে আর্সেনিকমুক্ত করা যায় না। পানি ফুটালে জীবাণু নষ্ট হলেও আর্সেনিক থেকে যায়, বরং পানি বাষ্পীভূত হলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বাড়তে পারে। তাই আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকার মানুষ বিকল্প হিসেবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারেন। এজন্য বাড়ির চাল বা পরিষ্কার ছাদ থেকে বৃষ্টির প্রথম দিকের পানি বাদ দিয়ে পরবর্তী পানি পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত ট্যাংকে রাখতে হবে। পান করার আগে সংরক্ষিত পানি ফুটিয়ে বা উপযুক্ত পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এছাড়া পরীক্ষিত নিরাপদ গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

আবু মাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৮/১০/২৬
০১৭১২৩৩৩২৯৯

 

 

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *