রবিবার , ১২ জুলাই ২০২০

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে রামের খোলা চিঠি

  • মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘ আয়ু কামনা করে এই মহা দুর্যোগের মধ্যে কিছু লেখা উচিত বলে মনে করলাম। জানিনা আমার এ লেখা আপনার কাছে পৌঁছাবে কিনা ? ২০০১ সালে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায় আপনার গাড়ি বহরে হামলার পর আপনার সাথে কয়েক দিন নিয়মিত টেলিফোনে ও মোবাইল ফোনে কথা হতো। আমি তখন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় দায়িত্বরত ছিলাম । ১৯ বছর আগের কথা আপনার স্মরণে থাকার কথা নয় । কিন্তু আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রয়েছে ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে গোটা পৃথিবীর মানুষ আজ ঘরবন্দি। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে মানুষের মৃত্যুর মিছিল প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। জনসংখ্যার অনুপাতে অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের মৃত্যুর হার কিছুটা কম । পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আপনি শুরুতেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

আপনার নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। অঘোষিত লকডাউন এর কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ আজ ঘর বন্দী। বিশেষ করে শ্রমজীবী দিনমজুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাঝারি ব্যবসায়ী ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার কারণে দেশের কয়েক কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের মাঝে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই মুহূর্তে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর হাতে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া খুবই কঠিন। তারপরও দেশের মানুষ আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রতিদিন যে বরাদ্দ রেখেছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে হয়েছে। ত্রাণের দাবিতে কর্মহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মিছিল অবরোধ ও ত্রাণ লুটের ঘটনা নিশ্চয় আপনার দৃষ্টিতে আসছে । এই সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই ।রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ গ্রুপ অনেক সময় কর্মহীন এসব মানুষ গুলোকে পিছন দিক থেকে উস্কে দিচ্ছে বলে মনে হয় ।

আপনার প্রেস উপ-সচিব জনাব আশরাফুল আলম খোকনের লেখাটা মন দিয়ে পড়লাম। ৭৪” এর দুর্ভিক্ষ ও বাসন্তীর শরীরে জাল জড়িয়ে কৃত্রিম ছবি তোলার কাহিনী তিনি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু যা ঘটার তা ঘটে-গিয়েছিল। প্রতিদিন ত্রাণ চুরির খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে। আর এই ত্রাণ চুরি সাথে যারা জড়িত তাদের দলীয় পরিচয় বড় করে দেখা হচ্ছে। কিন্তু উনারা আবার জনপ্রতিনিধিও বটে। আপনি মহা-দুর্যোগের কোন কিছু অনিয়ম হলে কাউকে ছাড়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আপনি যখন কোন ঘটনায় নড়েচড়ে বসেন তখন মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনযন্ত্র তিনগুণ সজাগ হয়ে যায়। তারপরও যখন একের পর এক ত্রাণ চুরির ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয় তখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিচিত এক জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামীলীগ নেতার সাথে কথা বলছিলাম। তিনি বললেন ত্রাণের চালে ৩৩০০০ ভোল্টেজ। হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে। জেনেশুনে কোন জনপ্রতিনিধি এ কাজ করবে না।

ওই চেয়ারম্যানের কাছে প্রশ্ন করছিলাম সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় যে চাল উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে এগুলো কি ? তিনি বললেন চালের গায়ে মার্কামারা থাকে না। কোনটা ত্রাণ- আর কোনটা কাবিকা ও টি আর । তিনি বললেন, কাবিখা ও টি আর এর চাল চেয়ারম্যান মেম্বার ও সংস্লিষ্ঠ প্রকল্প চেয়ারম্যান বিক্রি করে সেই টাকায় কাজ করে থাকে। সারাদেশে এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যেই যেসব চাল উদ্ধার হয়েছে তা নিয়ে অনুসন্ধান করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। গত দুই সপ্তাহে একটি ইউনিয়নে ৬ থেকে ৮ টন পর্যন্ত চাল বরাদ্দ হয়েছে।

দিন হিসাব করলে দেখা যাবে এক থেকে দেড় টন করে প্রতিটি ইউনিয়ন চাল বরাদ্দ পেয়েছে। অভুক্ত মানুষ কে খাওয়াবে, না কি বিক্রি করবে ? অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে চাল উদ্ধার হচ্ছে, তার অধিকাংশই কাবিখা অথবা টিআরের চাল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য দেশের মানুষ জানতে পারছে ত্রাণের চালসহ যারা আটক হচ্ছে তারা আওয়ামী লীগের লোক। আমার মনে হয় মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনকে অবশ্যই বিচার-বিশ্লেষণ করেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

আর এসব ঘটনাকে ঘিরে ষড়যন্ত্রকারীরা মওকা নিচ্ছে। কারণে মাঠ প্রশাসনকে অবশ্যই সজাগ থাকা উচিত বলে আমি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে মনে করি। তারপরও যদি কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাকে ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। তবে সরকারের কোন চাল ত্রাণের আর কোনটা টিআর ও কাবিখা, সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করেই মাঠ প্রশাসনকে মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা উচিত। তা না হলে সরকার ও দলের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ব খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি মানুষ ইতোমধ্যেই খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ অবরোধ ও ও ত্রাণ লুটের খবর আপনার নিশ্চয়ই দৃষ্টিতে এসেছে। আমি দেশের একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত-ঘেঁষা সুন্দরবন উপকূলবর্তী সাতক্ষীরা জেলায় বসবাস করি। করোনার প্রভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ হতে দেখছি।

বিশেষ করে শ্রমজীবী দিনমজুর নিম্নমধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণী এরিমধ্যে খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে । এদের ঘরে চাল ফুরিয়ে গেছে। তাদের কথা হলো বাইরে বেরহলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু-ঝুঁকিতে পড়ব- আর ঘরে বসে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। এখন আমরা কি করব ? কয়েকদিন আগে আপনি ভিডিও কনফারেন্সে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলেছেন। ওই কনফারেন্সে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব মনসুর আহমেদ সাহেব বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেছিলেন।

আপনি বলেছিলেন বিষয়টি বিবেচনা করে দেখব। আমার অভিমত বরাদ্দ অনেক গুন বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যেই ১০ টাকা কেজি দরে রেশনিং সিস্টেম এর মাধ্যমে চাল বিক্রির যে সিদ্ধান্ত আপনি গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সময়ের প্রয়োজন। আপনি যথার্থই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন এটা দ্রুত কার্যকর করার প্রয়োজন। মানুষের ঘরে যখন খাবার থাকবে না,তখন শত চেষ্টা করেও তাদের ঘর বন্দী করে রাখা যাবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যেমন ষ্টেশনারী দোকান, মিষ্টির দোকান, ছোট মুদিব্যবসায়ী, চায়ের দোকানী, পানের দোকানী, নিম্নমধ্যবিত্ত ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী দিনমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কোন পরিসংখ্যান সরকারি দপ্তরে আছে বলে মনে হয় না। প্রায় তিন সপ্তাহ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ । দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ গুলোর কাজের অভাব, দিনমজুরদের কাজ না থাকা ইত্যাদি কারণে দুর্ভিক্ষের আগাম পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তবে আশার কথা এই বোরো ধানের বাম্পার ফলন ভালো হয়েছে।

কৃষক উৎপাদিত ধান ঘরে তুলতে পারলে খাদ্য সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। তবে সুষ্ঠভাবে সরকারি খাদ্য সামগ্রী বণ্টন না করতে পারলে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আমি একজন নাগরিক হিসেবে ও ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী হিসেবে বলতে চাই, রেশনিং সিস্টেম এ দ্রুত খাদ্য সামগ্রী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

আপনার সুস্বাস্থ্য ও আপনার সরকারের মঙ্গল কামনা করে এখানেই শেষ করছি। শত বছরের পরমায়ু নিয়ে দেশে সেবার প্রত্যাশা রেখেই বিদায় নিলাম ।

বিনীত,
রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী
RTV সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ও সম্পাদক,অনলাইন দৈনিক সংকল্প পত্রিকা ।

About ক্রাইমবার্তা ডটকম

Check Also

করোনার উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক বৃদ্ধা নারীর মৃত্যু

ক্রাইমবাতা রিপোট: সাতক্ষীরা:  করোনার উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক বৃদ্ধা নারীর মৃত্যু হয়েছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *