# বাঘ বাঁচলেই বাঁচবে সুন্দরবন বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
#বাঘ হারালে বিপর্যয় নেমে আসবে সুন্দরবনে
কমছে বাঘ
হুমকিতে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র
আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরা:
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন-এ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চলাচল ও আচরণে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক বন বিভাগ ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সূত্রে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য সংকট, লবণাক্ততার পরিবর্তন, আবাসস্থলের চাপ এবং মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা বাঘের স্বাভাবিক বিচরণপথকে প্রভাবিত করছে। বন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অংশ থেকে সুন্দরবনের বাঘের একটি অংশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় অংশের দিকে যাতায়াত করছে এমন পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি একদিকে যেমন প্রজনন ও বিচরণগত স্বাভাবিক প্রবণতা, অন্যদিকে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। অন্যদিকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, লবণাক্ত পানির বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঘনত্বও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
বিশ্বজুড়ে বাঘের বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা দিনের পর দিন কমছে। অনেক প্রজাতির বাঘ আজ লুপ্ত প্রায়। সব প্রজাতির বাঘকে অস্তিত্ব সঙ্কট থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যই প্রতিবছর ২৯ জুলাই পালন করা হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে এর শীর্ষ শিকারি রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাদের ভাষায়, বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের মূল নিয়ন্ত্রক। বাঘ কমে গেলে হরিণ ও অন্যান্য শিকার প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বনভূমির গাছপালা ও নবায়ন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ধীরে ধীরে পুরো বন ব্যবস্থাই ভারসাম্য হারাতে পারে। পরিবেশবিদরা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাশিকার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট চাপের কারণে ইতোমধ্যে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই তাদের মতে, “সুন্দরবন বাঁচাতে হলে আগে বাঘ বাঁচাতে হবে”এই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
সূত্রমতে, বাংলাদেশে ২০০৪ সালের পায়ের ছাপ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ধরা হয়েছিল ৪৪০টি। তবে ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপে তা নেমে আসে ১০৬-এ। ২০১৮ সালের শুমারিতে তা বেড়ে ১১৪টি হয়। বর্তমানে ধীরে ধীরে সামান্য বৃদ্ধি হলেও সংখ্যা এখনো “ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নস্তরে” ধরা হয়। বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ১২০-১২৫-এর মধ্যেই রয়েছে বলে বাঘ সংশ্লিষ্টরা জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাঘ সংরক্ষণে বিভিন্ন সময় পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বনভূমির ভেতরে অবৈধ প্রবেশ, মাছ ও বন্যপ্রাণী শিকারে বিষ ব্যবহারের অভিযোগও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য শুধু বাঘ সংরক্ষণ নয়, পুরো বন ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নতুবা এই অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২১/৬/২৬
ক্রাইম বার্তা