সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত চামড়া পাচারের আশংকা

স্টাফ রিপোটার: পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে সীমান্তের চোরাই পথে অবৈধভাবে ভারতে কোরবানি পশুর চামড়া পাচারের আশংকা করা হচ্ছে। চামড়া পাচাররোধে দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তে সর্বোচ্চ সর্তকর্তা জারি করেছে বিজিবি। সূত্রমতে, গেল কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানি পশুর চামড়ার দাম যথেষ্ট কম। সরকার গত বছরের তুলনায় দাম বৃদ্ধি করলেও অধিক মুনাফার আশায় কালোবাজারি সিন্ডিকেট চক্র ভারতে চামড়া পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর পশু কোরবানির সংখ্যা কমতে পারে, এমন আশংকা রয়েছে। এমনিতেই ভারতে গরু, মহিষ ছাগলের চামড়ার মূল্য বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ। ফলে মারোয়াড়ীদের প্রেসক্রিপশনে প্রতি বছর দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের অবৈধ রুট দিয়ে অধিক লাভের আশায় দেশের চামড়া ভারতে পাচার করে থাকে একটি অসাধু সিন্ডিকেট চক্র।
সূত্রমতে, দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত অবহেলা এবং একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কব্জায় বন্দি হয়ে ধ্বংসপ্রায়। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, যার অন্যতম প্রমাণ প্রতি কোরবানির ঈদে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া ভারতে পাচার হওয়ার ঘটনা।
এবছর প্রথমবারের মতো সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে কোরবানির সময় চামড়া পাচাররোধের আশা করছেন ট্যানারি মালিকরা। গত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা গেছে, কোরবানির ঈদের সময় দেশজুড়ে সংগৃহীত বিপুল কাঁচা চামড়ার একটি বড় অংশ পাচার হয়ে যেত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চামড়া পাচার করলেও, সরকার তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। শিল্প মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাচারের পথগুলো নজরদারিতে আনা হয়েছে, এবং মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া রফতানি .২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০৭.৬১ মিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছর যা ছিল ১১৭.২৭ মিলিয়ন ডলার। এদিকে, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ায় প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা এবং খাসির চামড়ায় তিন টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকার বাইরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। গত বছর গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ছিল। সেই হিসেবে বছর প্রতি বর্গফুটের দাম দুই টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চামড়া পাচাররোধের প্রস্তুতি জানতে চাইলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) (৪৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, চামড়া আমাদের দেশের সম্পদ। এই সম্পদ যাতে কোনভাবেই সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার না হয় এজন্য বেনাপোল সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকায় ঈদের দিন সকাল থেকেই বাড়তি নিরাপত্তা সর্বোচ্চ সর্তকর্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাতক্ষীরা যশোর বিজিবি ব্যাটেলিয়ান অধীনে সকল ক্যাম্প সর্তক রয়েছে। তাদেরকে বাড়তি নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
দেশের চামড়া শিল্পকে রক্ষা এবং অবৈধ পাচাররোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চামড়া পাচাররোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার চায় একটি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় চামড়া শিল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ সংরক্ষণে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা তৈরি না হয়।
উল্লেখ্য, দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভরসার জায়গা ছিল চামড়া শিল্প। তৈরি পোশাক খাতের পরই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা পালন করত এই শিল্প। ২০১৪১৫ অর্থবছরে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাতে পরিণত হয়। সে সময়ও কোরিয়া, ইতালি, স্পেন, চীন, জাপান, তাইওয়ানসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের এই শিল্পের ক্রেতা ছিল। তখন মৌসুমে বছরে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতো। কিন্তু এই শিল্প ঘিরে গড়ে ওঠা অব্যস্থাপনা, কর্তৃৃপক্ষের সঠিক নজরদারি না থাকা অভ্যন্তরীণ আরো কিছু বড় সমস্যার কারণে এই শিল্প আজ ধ্বংসের পথে। এই সুযোগে পাশের দেশ ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশ সরাসরি লাভবান হচ্ছে।
২০০০ সালের শেষভাগ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের স্বর্ণযুগ। ইউরোপ আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি লেদার লেদার পণ্যের চাহিদা বাড়ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬১৭ সালকে সরকারিভাবেচামড়া বর্ষঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চামড়া শিল্পের পতন সেই সময় থেকেই শুরু হয়।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *