# বেঁচে আছে কেবল ভগ্নদশায় স্মৃতিচিহ্ন # তলা প্রাসাদ আজ আগাছার জঙ্গল
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা:
একসময় যেখানে মুখর থাকত রাজকীয় সুর আর মানুষের পদচারণায়, আজ সেখানে কেবল নীরবতা আর ধ্বংসের স্তূপ। সারি সারি স্তম্ভ, খিলান, দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ আর বিশাল তিনতলা প্রাসাদ—সবকিছুই আজ কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নকিপুর জমিদারবাড়ির জৌলুশ আজ শুধুই স্মৃতি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং চরম অযত্নে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনের চারপাশ এখন পুরোপুরি ঢেকে গেছে গাছপালা, কলাগাছ ও ঘাস-আগাছায়।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর সদর থেকে পূর্ব দিকে মাত্র দুই কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়ে শতবর্ষী এই জমিদারবাড়ির ভগ্নাবশেষ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময়ের ২১২ ফুট দীর্ঘ এই বিশাল ভবনের পূর্ব পাশের অধিকাংশ দেয়ালই ধসে পড়েছে। ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি খসে পড়েছে দেয়ালের পলেস্তারা। প্রাসাদের সামনের মাঠের দক্ষিণ পাশে চারচালা আদলে তৈরি জোড়া শিবমন্দির তুলনামূলক ভালো অবস্থায় টিকে থাকলেও, পুকুরঘাটের কাছে অবস্থিত অষ্টকোনা আকৃতির দোতলা নহবত খানাটির বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে এই পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির ভেতরে যাওয়ার বা থাকার অন্য কোনো উপায় না থাকায় অসহায়ত্ব নিয়ে বসবাস করছেন আনোয়ারা বেগম ও ফাতেমা বেগম নামের দুই নারী।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো সাথী খাতুনের ‘মনুমেন্টস অ্যান্ড মেমোরি: দ্য আর্কিটেকচারাল ওয়ার্কস অব জমিদার হরিচরণ রায়’ শীর্ষক গবেষণায় এই জমিদারবাড়ির সুদীর্ঘ ইতিহাস উঠে এসেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে এটি প্রকাশিত হয়।
চারুচন্দ্র মণ্ডলের ‘নকিপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৮ সালে শ্যামঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী এই জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করেন। ১৮৯৯ সালে তাঁরই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘নকিপুর মাইনর স্কুল’ বর্তমানের ‘নকিপুর হরিচরণ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়’ হিসেবে পরিচিত। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ৯২ নম্বর নকিপুর মৌজার ২ দশমিক ৯২ একর জমির ওপর এই প্রাসাদে একসময় ৩৯টি কক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৫০ সালে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্তির পর উত্তরাধিকারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ১৯৭১ সালে তাঁরা কলকাতায় চলে যাওয়ার পর থেকেই বাড়িটি সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। একসময়ের অমূল্য সব সামগ্রীও লুটপাট হয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যের বিরল নিদর্শন এবং এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে নকিপুর জমিদারবাড়িটি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা সমৃদ্ধ করবে দেশের পর্যটন খাতকে এবং নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে সমৃদ্ধ ইতিহাস।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাউসার আজিজ জানান, জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর মধ্যে নকিপুর জমিদারবাড়ি অন্যতম। স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অধিদপ্তর থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
৮/১১/২৬
০১৭১২৩৩৩২৯৯
ক্রাইম বার্তা