ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও জনসম্পৃক্ততার প্রতীক সাতক্ষীরার আল-আমিন ট্রাস্ট ভবন: জেলা জামায়াতের প্রাণকেন্দ্র

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরা শহরের মুন্সিপাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তিনতলা বিশিষ্ট আল-আমিন ট্রাস্ট ভবনটি কেবল একটি কার্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা জেলার সাংগঠনিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও জনসম্পৃক্ততার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভবনটি জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক, দাওয়াতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নেতা-কর্মী, শুভানুধ্যায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এ ভবন। এখানে অনুষ্ঠিত হয় সাংগঠনিক বৈঠক, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, মতবিনিময় সভা, সামাজিক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আমিন ট্রাস্টের অধীনে গড়ে ওঠা এ ভবন বর্তমানে জেলা জামায়াতে ইসলামী, জেলা মহিলা জামায়াত, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন, যুব বিভাগ, সংস্কৃতি বিভাগ, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ওলামা বিভাগ, পেশাজীবী বিভাগ, পৌর ও সদর জামায়াত এবং জেলা ও শহর শিবিরের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচিতে প্রাণবন্ত থাকে পুরো প্রাঙ্গণ।
ভবনের অন্যতম আকর্ষণ ‘কাজী শামসুর রহমান মিলনায়তন’। সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য মরহুম কাজী শামসুর রহমানের নামে নামকরণ করা এ মিলনায়তনে সারা বছর কর্মী সম্মেলন, সেমিনার, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, তারবিয়াতি মজলিস, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কারণে কার্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং একপর্যায়ে এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় জনগণ ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্যোগে কার্যালয়টি পুনরায় চালু হয়। এরপর থেকে নতুন উদ্যমে শুরু হয় সাংগঠনিক কার্যক্রম।
বর্তমানে জেলা জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল। তাঁর নেতৃত্বে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক সেবামূলক উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
আল-আমিন ট্রাস্ট ভবনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের ক্ষেত্রে তৎকালীন জেলা আমীর ও বর্তমান সংসদ সদস্য মুহা. ইজ্জত উল্লার অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। সংগঠনের নেতাকর্মীদের মতে, ভবনটির পরিকল্পনা, সাংগঠনিক সমন্বয় ও বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী।
একই সঙ্গে সাতক্ষীরায় জামায়াতের সাংগঠনিক ইতিহাসের আলোচনায় মরহুম কাজী শামসুর রহমান এবং বর্তমান সংসদ সদস্য, ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁদের নেতৃত্ব, আদর্শিক দিকনির্দেশনা ও সাংগঠনিক দক্ষতা জেলার জামায়াতকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়তা করেছে বলে সংগঠনের নেতাকর্মীরা মনে করেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে আল-আমিন ট্রাস্ট ভবনটি মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এখানে নিয়মিত নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি, শিক্ষার্থী ও যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, পেশাজীবী সম্মেলন এবং নৈতিক শিক্ষাভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও ভবনটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
বর্তমানে ভবনের পাশেই জেলা মহিলা জামায়াতের জন্য একটি নতুন বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এটি চালু হলে নারী সংগঠনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে।
সাতক্ষীরার মুন্সিপাড়ার আল-আমিন ট্রাস্ট ভবন আজ শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয় নয়; এটি বহু মানুষের কাছে স্মৃতি, সংগ্রাম, আদর্শ, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এর গুরুত্ব আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *