চাহিদা ১৫০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৯৫ মেগাওয়াট; গ্রাহক ৭ লাখের বেশি
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি ও ঘনঘন লোডশেডিংয়ে সাতক্ষীরার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদার প্রায় ৩৭ শতাংশ ঘাটতির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় বর্তমানে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ২৪ জন গ্রাহক রয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-এর আওতায় সাতক্ষীরা শহরাঞ্চলে গ্রাহক সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৯৮ জন। দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে জেলায় মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬ হাজার। অথচ ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি না পাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ মনা বলেন, “দিনে প্রচণ্ড গরম, রাতে আবার বিদ্যুৎ থাকে না। ফ্যান বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। ছোট বাচ্চারা কান্নাকাটি করে।”
কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের গৃহিণী সাবিনা খাতুন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে পানির মোটর চলে না। রান্না-বান্না, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজেই সমস্যা হয়। রাতের বেলা গরমে ঘরের ভেতর থাকা যায় না।”
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমরান শোন বলেন, “পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। অনেক সময় মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পড়তে হয়।”
কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শ্যামনগর উপজেলার কৃষক আব্দুল হালিম জানান, “সেচ পাম্প চালাতে সমস্যা হচ্ছে। সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফ্রিজ, কোল্ডস্টোরেজ, বরফকল ও মাছ সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে জাতীয় জ্বালানি সংকটের সময় সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়। ২০২৪ সালে জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১১০ মেগাওয়াট, সরবরাহ পাওয়া যেত ৬৮ মেগাওয়াট। তখনও প্রায় ৪২ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। বর্তমানে চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সচেতন মহলের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুতের অপচয় রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
জেলার সাধারণ মানুষের দাবি, তাপদাহের এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়বে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম)মুহাঃ আজিজুর রহমান সরকার বলেন,“গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সাতক্ষীরা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সোয়াইব হোসেন বলেন, “শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। কোথাও কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত তা সমাধানের জন্য আমাদের টিম কাজ করছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, “সাতক্ষীরায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জনদুর্ভোগ বাড়ছে। বিষয়টি আমি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। জেলার জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছি। আশা করছি, সরকার দ্রুতই এ সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হ লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
১৫/৬/২৬
ক্রাইম বার্তা