আশাশুনির প্রতাপনগরের দুর্ভোগ ভাসমান মসজিদ,সেতু ও বাঁশের সাঁকো

আশাশুনির প্রতাপনগরের দুর্ভোগ ভাসমান মসজিদ,সেতু ও বাঁশের সাঁকো
এস,এম মোস্তাফিজুর রহমান,আশাশুনি।।আশাশুনি উপজেলার ঘুর্ণিঝড়,সাইক্লোন ও ভাঙ্গন কবলিত,চরম দুর্দশাগ্রস্ত এলাকার অন্যতম প্রধান এলাকা প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ইউনিয়নবাসী বছরের পর বছর ভোগান্তি ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন যাপনের মধ্যদিয়ে হতাশা ও বিপন্নতায় পর্যবসিত হয়ে আছে। তাদের করুন পরিণতির অন্যতম পরাকাষ্টা উদাহরণ ৩৫০ ফুট ভাসমান সেতু,ভাসমান মসজিদ ও ৭০০ ফুট দৈর্ঘ্যের বাঁশের সাঁকো।
২০২০ সালের ২০ মে  ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রবল জলোচ্ছ্বাস প্রতাপনগর ইউনিয়নের উপকূলরক্ষা বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। এর পরের বছর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কোথাও বসতভিটা বিলীন হয়েছে,কোথাও সড়ক-সেতু-কালভার্ট হারিয়েছে অস্তিত্ব। অনেক জায়গা পরিণত হয়েছে নদী ও খালের সংযোগস্থলে।
ছয় বছর পরও প্রতাপনগরের কিছু এলাকায় সেই দুর্যোগের ক্ষত স্পষ্ট দৃশ্যমান। ইউনিয়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার অংশ এখনো পুনঃর্নির্মাণ হয়নি। ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ওপর নির্ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে। সাঁকো দুর্বল হয়ে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। বাঁশের উপর দিঢে চলাচল যেমন কষ্টকর, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু, বৃদ্ধ,রোগিদের নিয়ে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে আম্ফান ও ইয়াসের ছোবলে জর্জরিত হয়ে প্রতাপনগরের হাওলাদার বাড়ি বায়তুন্নাজাত জামে মসজিদও পানির কবলে পড়ে। মসজিদের চারপাশের রাস্তা পানিতে তলিয়ে ভেসে যায় এবং পানি মসজিদের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে পড়ে যে,মসজিদের ইমামকে কয়েক দিন সাঁতরে গিয়ে আজান দিতে নামাজ পড়তে হয়েছে। পরবর্তীতে পানিবন্দি মুসল্লিদের কথা বিবেচনা করে একটি বড় নৌকার ওপর তৈরি করা হয় ভাসমান মসজিদ। প্রায় ৫২ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট চওড়া ভাসমান মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৫০ জন নামাজ আদায় করতে পারতেন। সেখানে অজুর ব্যবস্থা, পানির জন্য চারটি ট্যাপ এবং একটি শৌচাগারও করা হয়। মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য একটি নৌকার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পরে সেখানে বাঁশের সাঁকো করা হয়েছে।
মসজিদ এলাকায় পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের জন্য বেসরকারি সংগঠন’শামসুল হক ফাউন্ডেশন চট্রগ্রামে প্রায় ৩৫০ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান ব্রিজ তৈরি করে। ৫৬টি দুই লিটারের ড্রাম,বিভিন্ন ধরনের কাঠ ও পেরেক ব্যবহার করে সেতুটি নির্মাণে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়। ভাসমান সেতুটি নির্মাণের ফলে অন্তত ওই এলাকার মানুষ কিছুটা স্বস্তি পান।
ভাসমান মসজিদ,ভাসমান সেতু ও বাঁশের সাঁকো কোনো এলাকার স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে সাময়িক ভাবে চলতে পারে। যা না থাকার চেয়ে কস্টকর যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসাবে সাময়িক উপকারের জন্য অনেক মূল্যবান। অথচ বছরের পর বছর ধরে মানুষ এমন অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকবে;রোগি পরিবহন,শিক্ষার্থীদের যাতয়াত,বৃদ্ধ ও মহিলাদের অসম্ভব পরিস্থিতি,নিত্যদিনের খাদ্য-পানীয় প্রয়োজন মেটানোসহ পোয়োজনীয় অনেক কিছু থেকে দীর্ঘকাল বঞ্চিত করে রাখা মেনে নেয়া যায়না।
প্রশ্ন হলো—একটি দুর্যোগের পর অস্থায়ী ব্যবস্থা কতদিন চলতে পারে? উপকূলের মানুষ কি বারবার ভাসমান স্থাপনা,নৌকা ও বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই জীবন কাটাবেন,নাকি স্থায়ী ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে? প্রতাপনগরের মানুষ এখন সেই স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় আছে।
উপাধ্যক্ষ মাওঃ অহিদুজ্জামান জানান,প্রতাপনগর ভালনারেবল ইউনিয়ন। অনেক ঝুঁকিতে বসবাস করি আমরা। সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা লন্ডভন্ড হওয়ার পর তাদের যাতয়াত ব্যবস্থা করতে কোন প্রতিষ্ঠান বা সরকার এগিয়ে আসেনি। বাধ্য হয়ে বাঁশের সাঁকো, ভাসমান সাঁকো,নৌকায় যাতয়াত ও ভাসমান মসজিদের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের জীবন মান রক্ষা ও দুর্ভোগ মেটাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমরা মাননীয় এমপি মহোদয়সহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।
ইউপি চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালী জানান, ১৯২০/২১ সালে ওয়াপদা বাঁধ ভেঙ্গে ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সনাতনকাটি ও কুড়িকাহুনিয়া ভেঙ্গে ৩০ ফুট গভীর হয়ে যায়। সাঁকো ও নৌকা পথের পাশাপাশি দীর্ঘ বিকল্প পথ পাড়ি দিয়ে তালতলা হয়ে দৈনন্দিন কাজ,বাজার,স্কুল-মাদ্রাসায় যাতয়াত করে থাকে। সাঁকো ভেঙ্গে অনেকে দুর্ঘটনায় পড়ছে। ভাসমান মসজিদ,ভাসমান সাঁকো করা হলেও তা দীর্ঘদিন চলতে পারেনা। মাননীয় এমপি, ডিসি, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ও এনজিওগুলোর কাছে আকুল আবেদন দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
উপজেলা এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার অনিন্দ্যদেব সরকার জানান,পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পাওয়ার পর সড়ক,সেতু ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *