পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা সাতক্ষীরার মান্দারবাড়িয়া

৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বেলাভূমি, এক পাশে সুন্দরবন অন্য পাশে বঙ্গোপসাগর

ছবি আছে:
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: এক পাশে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, অন্য পাশে বঙ্গোপসাগরের দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। মাঝখানে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাবেলা। কোথাও নদীর আঁকাবাঁকা পথ, কোথাও গোলপাতা-কেওড়া-গরানের সবুজ, আবার কোথাও সাগরের ঢেউ। প্রকৃতির এমন অপূর্ব মেলবন্ধনের নাম মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা এ সৈকত এখনও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির কারণে মান্দারবাড়িয়া কাঙ্ক্ষিত পরিচিতি পায়নি।

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। এ উপলক্ষে যখন দেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাবনা নিয়ে নানা কর্মসূচি চলছে, তখন সাতক্ষীরার মান্দারবাড়িয়াকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর ঘাট থেকে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতের দূরত্ব প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ কিলোমিটার। তবে এই পথ শুধু একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর যাত্রা নয়; পুরো পথজুড়েই রয়েছে সুন্দরবনের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
যাত্রাপথে দেখা যায় আঁকাবাঁকা নদী, চিরসবুজ গোলপাতা, কেওড়া, গেঁওয়া, গরান ও সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছ। ভাগ্য সহায় হলে চোখে পড়তে পারে হরিণ, বানর, বন্য শূকর, কুমির, রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ সুন্দরবনের নানা বন্যপ্রাণী। নদী ও বনজুড়ে শোনা যায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ডাক।
সুন্দরবনের গা ছমছমে পরিবেশ পেরিয়ে যখন সাগরের কাছে পৌঁছানো যায়, তখন দৃশ্যপট বদলে যায়। সামনে শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি। একদিকে বনভূমির সবুজ, অন্যদিকে সাগরের নীল—দুইয়ের মিলনে তৈরি হয় ভিন্ন এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
মান্দারবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। সাগরের দিগন্তে সূর্যের ওঠা-নামার দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য হতে পারে বিশেষ অভিজ্ঞতা।

প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই মান্দারবাড়িয়াকে দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্র থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিতে পারে। কারণ এখানে শুধু সমুদ্র নয়, একই ভ্রমণে সুন্দরবনের বন, নদী, বন্যপ্রাণী ও উপকূলীয় প্রকৃতির স্বাদ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের মূল শক্তি দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। এসব সম্পদ পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় পর্যটন পর্যটন বাজারের বৃহত্তম অংশগুলোর একটি। বিশ্বের ১৫০টি দেশে পর্যটন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শীর্ষ পাঁচটি খাতের একটি। ফলে মান্দারবাড়িয়ার মতো সম্ভাবনাময় উপকূলীয় এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা, পরিবহন, আবাসন, খাবার, নৌযান ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
মান্দারবাড়িয়ার পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর অন্যতম প্রধান শর্ত যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যটকদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, থাকার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, তথ্যকেন্দ্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
উপকূল ঘিরে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ এবং পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সড়ক তৈরির মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। এর প্রভাব শুধু পর্যটনে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
মান্দারবাড়িয়াকে টেকসই পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। স্থানীয় মানুষকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল তাদের কাছেও পৌঁছাতে পারে।
সৈকতভিত্তিক বিনোদন, সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন, ইয়টিং, মেরিনা ও নটিক্যাল বোটিংয়ের মতো কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা গেলে পর্যটনের পরিধি বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ চালু হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে একটি টেকসই পর্যটন মডেল গড়ে উঠতে পারে।
মান্দারবাড়িয়া সুন্দরবনের পশ্চিম সুন্দরবন রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সাতক্ষীরা পশ্চিম সুন্দরবন রেঞ্জের সহকারী বন কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত পশ্চিম সুন্দরবন রেঞ্জের মধ্যে সাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের অভয়ারণ্য অঞ্চলে অবস্থিত। এখানকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে উপযুক্ত পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে মান্দারবাড়িয়া কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হতে পারে। তার মতে, এতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের এই মিলনভূমি তাই শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আধার নয়; সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন হলে মান্দারবাড়িয়া হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৬/৯/২৬

About news-admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *