রাজশাহী বিভাগের গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে ২ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ করা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা। তবে সড়ক নির্মাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি প্রকল্পের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। এর মধ্যে শুধু আউটসোর্সিং খাতেই ২২ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং পরামর্শক খাতে ৩ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রস্তাবিত ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প- রাজশাহী বিভাগ’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। রাজশাহী বিভাগের আট জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী, আউটসোর্সিং খাতে ২২ কোটি ৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতে ৫৪ জন জনবলের সংস্থান দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, পরামর্শক খাতে ৩ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই দুই খাতেই ব্যয়ের প্রস্তাব ২৫ কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ২ কোটি টাকা, পরিবহন সেবা খাতে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং আপ্যায়ন খাতে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অনিয়মিত শ্রমিকের মজুরি, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ, বই ও সাময়িকী, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, সেমিনার ও সম্মেলনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পরিচালন খাতে অর্থ রাখা হয়েছে।
এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। পিইসি কার্যপত্রের পর্যবেক্ষণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে ১০ লাখ টাকা, অনিয়মিত শ্রমিকের মজুরি খাতে ২০ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ১০ লাখ টাকা, বই ও সাময়িকী খাতে ১০ লাখ টাকা এবং নিরাপত্তা সেবা সংগ্রহ খাতে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এসব খাতের ব্যয় নিয়ে আলোচনা করে ডিপিপি পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন।
বিশেষ করে নিরাপত্তা সেবা সংগ্রহ খাতে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাদ দেওয়ার বিষয়েও সভায় আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্তভাবে ব্যয় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং পিইসি সভায় পর্যালোচনার জন্য কমিশনের সুপারিশ।
শুধু প্রশাসনিক ব্যয় নয়, প্রকল্পের অন্যান্য খরচ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কার্যপত্রের পর্যবেক্ষণে ইউ-ড্রেন নির্মাণের প্রস্তাবিত দর সমজাতীয় অন্যান্য চলমান প্রকল্পের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ১২৪ মিটার সেতু নির্মাণ, ৩৬ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৩০ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৯৫২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন। এ ছাড়া ৩২৫ দশমিক ৭১ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন, ১৮ হাজার মিটার ইউ-ড্রেন এবং ৫৪৪ মিটার বক্স কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি ও অকৃষি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সহজ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা। তবে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে মূল নির্মাণকাজের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের প্রতিটি খাতের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় যৌক্তিকীকরণ, প্রস্তাবিত ব্যয়ের ভিত্তি স্পষ্ট করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে।
ক্রাইম বার্তা